লাকসাম মিডিয়া গ্যালারী

#htmlcaption1 লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected

নাট্যকর্মী নেবে লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস

যোগাযোগ এম এ জলিল....+8801716496603 এম সোহেল......+8801825399243 E-mail...lakshammultimediahouse@gmail.com www.facebook.com/lakshammultimediahouse www.lakshamlive.blogspot.com

লাকসাম উপজেলা.

লাকসাম উপজেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। কুমিল্লা সদর থেকে মাত্র ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণে ডাকাতিয়া নদীর তীরে এই উপজেলাটি অবস্থিত। বর্তমানে লাকসাম একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। লাকসাম শহরটি বাণিজ্যের শহর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের বৃহত্তম পাঁচটি রেলওয়ে জংশনের মধ্যে একটি এখানে অবস্থিত। লাকসাম থানাকে উপজেলায় রুপান্তরিত করা হয় ১৯৮২ সালে।

আকর্ষণীয় স্থান সমূহ.

অনেকেই এক দিনের ছুটিতে ঘুরার জন্য প্লেন খুঁজে বেরায়, আর আমি নিয়ে এলাম একদিন ঘুরার দারুণ এক প্লেন। প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরতে আসে কুমিল্লায়। কুমিল্লাতে বহুসংখ্যক পর্যটন আকর্ষন রয়েছে। কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি পাহাড়ে একটি সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। এখানে রয়েছে শালবন বিহার, কুটিলা মুড়া, চন্দ্রমুড়া, রূপবন মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, সতের রত্নমুড়া, রাণীর বাংলার পাহাড়, আনন্দ বাজার প্রাসাদ, ভোজ রাজদের প্রাসাদ, চন্ডীমুড়া প্রভৃতি।

ছোট নাটিকা.

জুনিয়র প্রেমিকলেখাঃ রাজিব (দরিদ্র বালক)ঠাস করে একটা শব্দ, ডান গালে তীব্র ব্যথা, চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি! চোখ বন্ধ করে গালে হাত দিয়ে চুপ করে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর চোখ খুলে দেখি মেয়েটি সামনে এখনো দাঁড়িয়ে আছে! চশমা পরা, রাগী চেহারা, রাগে মুখ লালচেহয়ে আছে! কিছু একটা হয়েছে, কিহয়েছে?এসো একটু পেছনে যাই..ব্যস মাত্র পাঁচ মিনিট...এসো.."

লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস.

লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস

Showing posts with label কৃষি চাষ. Show all posts
Showing posts with label কৃষি চাষ. Show all posts

Monday, 22 May 2017

টবে পুদিনা পাতার চাষ

ঘরের ভেতর পুদিনা পাতার চাষ
পুদিনা পাতা এক ধরনের সুগন্ধি গাছ। এই গাছের পাতা তরি-তরকারির সাথে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে বেশি ব্যবহার করা হয় নানা ধরনের বড়া তৈরির কাজে। বিশেষ করে রমজানের এই মাসে বাড়ি কিংবা ইফতারের দোকানগুলোতে ব্যাপকভাবে পুদিনা পাতা ব্যবহার হয়ে থাকে। এছাড়াও বোরহানী, সালাদ এমনকি ফুড ডেকোরেশন এর কাজেও ব্যবহার করা হয় এই পাতা। চাইনিজ রেষ্টুরেন্ট, পাঁচতারা হোটেলেও রয়েছে পুদিনা পাতার নানা ব্যবহার। যারা রমজান মাসে পুদিনা পাতা পেতে চান তাদের এখনই বাড়ির ছাদে, বেলকনিতে অথবা বারান্দার গ্রীলে চাষ করতে পারেন এই পুদিনা পাতার গাছ। 
চাষ কৌশল:
যে সব তেলের কন্টেইনার ফেলে দেয়া হয়, সেগুলো সংরক্ষণ করে খুব সহজেই চাষ করা যায় পুদিনা পাতার গাছ। এজন্য কন্টেইনারে শুকনো গোবর বা ফেলে দেয়া চা-পাতার সাথে দো-আঁশ মাটি ভালভাবে মেশাতে হবে। সেক্ষেত্রে গোবর ২কেজি, দো-আঁশ মাটি ৪ কেজি হারে মেশালে ফলাফল ভাল পাওয়া যাবে। ওই মিশ্রন থেকে প্রতিটি টব বা কন্টেইনারে ৩ থেকে ৪কেজি মিশ্রন স্থাপন করে পুদিনা পাতার গাছ লাগাতে হবে। অনেক নার্সারিতে পুদিনা পাতার গাছ পাওয়া যায়। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এই গাছের একটি পুরানো ডাল শিকড়সহ কেটে টবে বা কন্টেইনারে রোপন করলেই কিছুদিনের মধ্যে ওই পাত্র পুদিনা পাতার গাছে ভরে যায়। তাই প্রথমদিকে ২/৩টি গাছ সংগ্রহ করলে আর কখনও চারার জন্য অন্য জায়গায় যেতে হয় না। কন্টেইনারে বা টবে লাগানো গাছগুলো প্রয়োজনে তার দিয়ে বেঁধে বারান্দায় ঝুলিয়ে রাখা যায় অথবা ছাদেও এর চাষ করা যায়। যারা শহরে থাকেন তারা ছাদে, বরান্দায় এবং বেলকনিতে এর চাষ করতে পারেন। 
অন্যান্য ব্যবস্থাপনা:
পুদিনা গাছের তেমন কোন যত্নের দরকার হয় না। তবে ২/৩ দিন পরপর সামান্য পানি দিতে হয়। এই গাছে সূর্যের আলোর তেমন প্রয়োজন হয় না তাই ডেকোরেশন প্লান্ট হিসেবে ঘরের মধ্যেও টবে লাগানো যেতে পারে। সেক্ষেত্রে মাঝে মাঝে টবগুলো বাইরে এনে গাছের গোড়ার মাটিগুলো আলগা করে দিতে হবে। লাগানো পাত্রের নীচে ২/৩টি ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে যাতে করে বাড়তি পানি পড়ে যায় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি পুরণ হয়। এ ছাড়াও ছাদের কোন এক স্থানে পলিথিন বিছিয়ে তার চারপাশে ইট অথবা বেড়া দিয়ে তারমধ্যে গোবর বা চা-পাতা মিশ্রিত মাটি দিয়েও পুদিনা পাতার চাষ করা যায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করেও এই পাতা থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা সম্ভব।
এগ্রোবাংলা ডটকম
বানিজ্যিকভাবে পুদিনাপাতার চাষ
বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, তেলেগু, তামিল সব ভাষাতেই এর এক নাম পুদিনা। এটা সুগন্ধিগাছগুলোর মধ্যে অন্যতম। ছড়ার মধ্যেও বাজার থেকে পুদিনাপাতা কেনার ফরমায়েশ পাওয়া যায় ‘পুদিনা আনিও, পান আনিও’। খাদ্যকে সুরেচক করতে পুদিনাপাতার কোনো জুড়ি নেই। শহরাঞ্চলে দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। সুদূর অতীত থেকে এ দেশে পুদিনাপাতার চাষ হয়ে আসছে। কিন্তু সেটা বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ নয়, কোনোভাবে বাড়ির আঙিনায় দু-চারটা গাছ লাগিয়ে পারিবারিকভাবে ব্যবহার করা। আজকাল বাজারে আঁটি আঁটি পুদিনাপাতা সারা বছর বিক্রি হচ্ছে। তাই পুদিনাকে শুধু বাড়ির আঙিনায় আটকে রাখা ঠিক হবে না। চাইলে অন্য ফসলের মতো বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে লাভবান হওয়া যাবে। বিদেশেও পুদিনাপাতার চাহিদা আছে। রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও সুযোগ হতে পারে। পুদিনাপাতার ওপর ভিত্তি করে স্খাপিত হতে পারে পিপারমেন্ট অয়েল উৎপাদন শিল্প।
গাছ পরিচিতি : পুদিনা একটি সাধারণ আগাছা ধরনের গাছ। কাণ্ড ও পাতা বেশ নরম। কাণ্ডের রঙ বেগুনি, পাতার রঙ সবুজ। পাতা ডিম্বাকার, পাতার কিনারা খাঁজকাটা। পাতা কিছুটা রোমশ ও মিন্টের তীব্র গìধযুক্ত। গাছের নিচের অংশ থেকে অনেক ধাবক বের হয়। পুদিনাপাতার গাছ লেবিয়েটিসি পরিবারের মেন্থা গনের অন্তর্গত। এ গনের তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে গপষয়ভথ থড়ংপষঢ়মঢ় এ দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে ভালো জন্মে। জাপানি জাত চাষের জন্য ভালো। 
ব্যবহার : পুদিনাপাতার গাছ থেকে পিপারমেন্ট তেল তৈরি হয়। তেল বেশ মূল্যবান। বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী বিশেষ করে টুথপেস্ট, মিন্ট চকোলেট ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১০ টন পিপারমেন্ট তেলের শিল্প চাহিদা রয়েছে বলে জানা যায়। এই পরিমাণ তেল উৎপাদনের জন্য ১০ হাজার একর জমিতে পুদিনা উৎপাদন করতে হয়। কিন্তু উৎপাদন অনেক কম হওয়ায় প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার পিপারমেন্ট অয়েল তাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এ দেশের বাজারে মূলত কাঁচা পুদিনাপাতার চাহিদাই বেশি। প্রতি বছর আমাদের দেশে প্রায় ১৮ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা পুদিনাপাতার চাহিদা রয়েছে। 
পুদিনা এ দেশে চাষ হয় মূলত চাটনি, সালাদ আর বোরহানি বানানোর জন্য। এর যে আরো অনেক ব্যবহার আছে সেটাই হয়তো আমরা জানি না। কাঁচা পুদিনাপাতার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় চাটনি ও সালাদে। ইদানীং বিভিন্ন পার্টিতে টক দইয়ের বোরহানি তৈরির জন্য পুদিনা পাতার ব্যবহার বেড়েছে। এ ছাড়া মাছ, গোশত, সস, স্যুপ, চা, তামাক, শরবত ইত্যাদি সুগìিধ করতে পুদিনাপাতা ব্যবহার করা হয়। ইউরোপের দেশগুলোতে ভেড়ার গোশতের রোস্ট ও মিন্ট জেলি তৈরি করতে পুদিনাপাতা ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন দেশে পুদিনার বেশি ব্যবহার তেল তৈরিতে। গাছে যখন ফল আসে তখনই পাতায় তেলের মাত্রা বাড়ে। ওই সময় গাছ তুলে পাতন প্রক্রিয়ায় তেল নিষ্কাশন করা হয়। গাছের নিচের পাতা হলদে হওয়া শুরু করলেই কাটিং নিয়ে তেল নিষ্কাশন করা হয়। মৌসুমে একই গাছ থেকে দু’বার কাটিং সংগ্রহ করা যায়। কাটিংগুলোকে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে ঝুলিয়ে শুকানো হয়। কাঁচা পাতার চেয়ে শুকনো পাতা থেকে তেল নিষ্কাশন সহজ ও সস্তা। 
চাষাবাদ : কাটিং বা তেউড় লাগিয়ে চারা তৈরি করা হয়। পুরনো ক্ষেত থেকে কাটিং নিয়ে হাপরে বসিয়ে চারা তৈরি করে নিতে হবে। কাটিংয়ের দৈর্ঘ্য হবে ১০ সেন্টিমিটার। জমিতে চারা রোপণের সপ্তাহখানেক আগে চারা তৈরি করতে হবে। প্রতি হেক্টর জমি চাষের সময় মাটির সাথে ১০ থেকে ১৫ টন গোবর বা জৈবসার মিশিয়ে দিতে হয়। জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরা করার পর চারা রোপণের আগে ৪৫-৫০ সেন্টিমিটার চওড়া করে বেড তৈরি করতে হয়। বেডের উচ্চতা হবে ১৫-২০ সেন্টিমিটার। প্রতি বেডের মাঝে নালা থাকবে। বেডের দৈর্ঘ্য জমির আয়তন অনুসারে কম-বেশি হতে পারে। তবে বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য বেডের আকার একটু অন্য রকম হবে। এ ক্ষেত্রে বেড ১ মিটার চওড়া ও ৪৫ মিটার লম্বা হবে। এ পরিমাণ জমির জন্য গোবর বা কম্পোস্ট সার লাগবে ২০ ঝুড়ি (২০০ কেজি), হাড়ের গুঁড়া ৫ কেজি, টিএসপি সার ১-১.৫ কেজি, কাঠের ছাই ৫ কেজি অথবা এমওপি সার ১ কেজি। এসব সার বেড তৈরির সময় বেডের মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বর্ষার আগে ও পরে চারা রোপণের নিয়ম। সে অনুযায়ী জুন অথবা অক্টোবর-নভেম্বর মাসে পুদিনার চারা রোপণ করা যেতে পারে। বেডে ৩০ সেন্টিমিটার পরপর চারা রোপণ করা যেতে পারে। চারা রোপণের পর সেচ দিতে হবে। প্রতি দুই মাস পরপর প্রতি বর্গমিটারে ২০ গ্রাম করে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। গাছ লম্বা হতে শুরু করলে ১০ সেন্টিমিটার মাপের কাটিং বা ডাল কেটে ১০-১৫টি ডাল একটি আঁটিতে বেঁধে বাজারে বিক্রির জন্য পাঠাতে হবে। প্রতি দু’বার কাটার পর একই নিয়মে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার দেয়ার পর সেচ দিতে হবে। বাণিজ্যিক জমিতে চারা রোপণের ১০-১২ সপ্তাহ পর থেকে প্রতি মাসে একবার করে প্রতি বর্গমিটারে ২০ গ্রাম করে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করে যেতে হবে।

টবে ব্রোকলি চাষ

টবে ব্রোকলি বা সবুজ ফুলকপি চাষ
ব্রোকলি। একটা উৎকৃষ্ট সবজি, তবে মাঠ থেকে তোলার পর তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায় বলে টবে চাষ করতে পারলে ভাল হয়। ব্রোকলিতে ভিটামিন সি, ক্যারোটিন ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশি আছে। এছাড়া অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে অল্প পরিমাণে। 
জাত:
আমাদের দেশে এল সেন্ট্রো, ডি সিক্কো, প্রিমিয়াম ক্রস, গ্রীন কমেট ইত্যাদি জাতের ব্রোকলি পাওয়া যায়। 
সময়: আশ্বিন-অগ্রহায়ণ (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) চাষের সময়। 
বীজ থেকে চারা তৈরি:
বীজ থেকে চারা তৈরি করে মূল টবে লাগাতে হবে। বীজ গজাতে সময় লাগে ৩/৪ দিনে। ৮/৯ দিন বয়সের চারা তুলে অল্প দূরত্বে আরেকটি বীজতলার টবে লাগাতে পারলে শক্তিশালী চারা পাওয়া যাবে। 
সার ও মাটি:
গোবর, টিএসপি ও খৈল দিয়ে সার-মাটি তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে মাটি সব সময় নরম তুলতুলে থাকলে গাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে। 
চারা রোপণ:
৩/৪ সপ্তাহের সুস্থ চারা সার-মাটি ভরা টবে লাগতে হবে। চারা লাগাতে হবে 
বিকাল বেলাতে। চারা লাগানোর পর গোড়ায় মাটি খুব হালকা করে চেপে দিতে হবে। কেননা জোরে চাপ দিলে নরম শিকড় ছিঁড়ে যেতে পারে। 
পরিচর্যা: 
 ব্রোকলির চারা লাগানোর প্রথম ৩/৪ দিন চারাকে ছায়া দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে
এবং চারা না লেগে যাওয়া পর্যন্ত সকাল-বিকাল পানি দিতে হবে। চারা লেগে গেলে মাঝে মাঝে মাটি একটু খুঁচিয়ে দিতে হবে এবং ২/১ দিন পর পর সেচ দিতে হবে। গাছ একটু বড় হলে ১৫ দিন পরপর তরল সার বা পাতার সার দিলে ভাল হয়। পরে গোড়ার মাটি চারদিক থেকে তুলে দিতে হবে এবং টবের কিনার বরাবর সেচ দিতে হবে। 
ক্ষতিকর পোকা: শুঁয়া পোকা ও জাব পোকা ব্রোকলির ক্ষতি করে। 
প্রতিকার:
জাব পোকা বেশি হলে রিডেন ও শুঁয়া পোকা বেশি হলে মার্শাল ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে সহকারি উপ-কৃষি কর্মকতার পরামর্শ অনুযায়ী। যদি শুঁয়া পোকা এবং জাব পোকা একসাথে আক্রমণ করে তাহলে নাইট্রো ওষুধ স্প্রে করা যেতে পারে। 
ফসল সংগ্রহ:
ব্রোকলির চারা রোপণের পর ৩ থেকে সাড়ে ৩ মাসের মধ্যে সবজিটি খাবার উপযোগী হয়। ব্রোকলির কাণ্ডের শাঁস খুব নরম হয় বলে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। ফুল ২/৩ সপ্তাহ হলে খাওয়ার উপযোগী হয়। ফসল সংগ্রহের সময় প্রথমে উপরের ফুলটি কেটে নিয়ে গাছটি বাড়তে দিলে নিচের পাতার গোড়া থেকে আবার ফুল বের হবে যা পরবর্তীতে সময়মত সংগ্রহ করা যাবে। 

মাশরুম চাষ

মাশরুম চাষ
আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে ছায়াযুক্ত স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কিংবা স্তূপীকৃত গোবর রাখার স্থানে ছাতার আকৃতির সাদা রংয়ের এক ধরনের ছত্রাক জন্মাতে দেখা যায়। একে আমরা ব্যাঙের ছাতা বলে অভিহিত করে থাকি। আগাছার মতো যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা এসব ছত্রাক খাবার উপযোগী নয়। অনুরূপ দেখতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের মাধ্যমে যে ব্যাঙের ছাতা উত্পাদিত হয়, তা অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং বিশ্বে সবজি হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই ব্যাঙের ছাতাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘মাশরুম’। মাশরুমের চাষে এবং এর ব্যবহার আমাদের দেশে তেমন প্রসার ঘটেনি। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে শুধু চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলোয় মাশরুম স্যুপ একটি উপাদেয় খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়। তবে পৃথিবীর বহু দেশে স্যুপ ছাড়াও এটা অন্যান্য সবজির মতো খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। মাশরুম একদিকে যেমন অত্যন্ত কম সময়ে উত্পাদিত হয়, তেমনি এগুলো রান্না করতেও সময় কম লাগে। মাত্র তিন-চার মিনিটেই মাশরুম সিদ্ধ হয়ে যায়।
মাশরুম একটি পুষ্টিকর খাবার। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমিষ এবং হজমে সাহায্যকারী এনজাইম রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম মাশরুমে থাকে ৩.১ গ্রাম আমিষ, ০.৮ গ্রাম স্নেহ, ১.৪ গ্রাম খনিজ পদার্থ, ০.৪ গ্রাম আঁশ, ৪.৩ গ্রাম শর্করা, ৬ মি. গ্রাম কেলসিয়াম, ১১০ মি. গ্রাম ফসফরাস, ১.৫ মি. গ্রাম লৌহ, ০.১৪ মি. গ্রাম ভিটামিন বি১, ০.১৬ মি. গ্রাম বি২, ২.৪ মি. গ্রাম নায়াসিন, ১২ মি. গ্রাম ভিটামিন সি। এছাড়া খাদ্যশক্তি থাকে ৪৩ কেলোরি। সাধারণত মাশরুমে মাছ-মাংসের চেয়ে কিছু বেশি এবং প্রচলিত শাক-সবজির চেয়ে দ্বিগুণ খনিজ পদার্থ থাকে। আমিষের পরিমাণ থাকে বাঁধাকপি ও অন্যান্য শাক-সবজির চেয়ে চারগুণ। এছাড়াও এতে যে ফলিক এসিড থাকে তা অ্যামিনিয়া প্রতিরোধে সহায়তা করে। বহুমুত্র রোগী এবং যারা মোটা তাদের জন্য মাশরুম একটি উত্তম খাবার। এটা খেতে বেশ সুস্বাদু এবং সহজেই হজম হয়। 
মাশরুম চাষ অত্যন্ত লাভজনক। মাত্র ১০-১৫ দিনেই খাবার উপযোগী হয়। এটা চাষের জন্য আবাদী জমির প্রয়োজন হয় না। চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সহজলভ্য। বেকার যুবক-যুবতী এবং মহিলারা ঘরে বসেই এর চাষ করতে পারেন। অন্যান্য সবজির তুলনায় বাজারে এর দাম অনেক বেশি, এজন্য এটা চাষ করা অত্যন্ত লাভজনক। অভ্যন্তরীণ বাজার ছাড়াও বিদেশে রফতানির সুযোগ বিদ্যমান। গ্রীষ্মকালে যে কোনো চালা ঘরের নিচে এবং বারান্দায় চাষ করা যায়। বর্ষাকালে পানি প্রবেশ করে না অথচ বাতাস চলাচলের সুবিধা আছে এমন ঘরে এর চাষ করতে হয়। শীতকালে ভেজা স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরে এর চাষ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে গ্রীষ্ম এবং বর্ষাকালে ‘স্ট্র মাশরুম’ এবং শীতকালে ‘ওয়েস্টার’ জাতের মাশরুম চাষ উপযোগী।
মাশরুম পুষ্টিকর এবং ওষুধিগুণসম্পন্ন একটি উৎকৃষ্ট সবজি। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মাশরুম চাষের জন্য উপযোগী। মাশরুম চাষের উপকরণ খড়, কাঠের গুঁড়া, আখের ছোবড়া অত্যন্ত- সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এ সবজিটি ঘরের মধ্যে চাষ করা যায় এবং মাত্র ৭-১০ দিনের মধ্যেই মাশরুম পাওয়া যায় যা অন্য ফসলে পাওয়া যায় না। চাষাবাদে কোন খরচ নেই বললেই হয়। জমির প্রয়োজন হয় না। 
বর্তমানে বাংলাদেশে চাষকৃত মাশরুম হচ্ছে কিং ওয়েস্টার, বাটন, শিতাকে, ইনোকি, মিল্কী হোয়াইট, বীচ, স্যাগী, নামেকো, পপলার ও স্ট্র । 
খড়ের বেডে মাশরুম চাষ সাধারণত দুধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রথম ১৭ থেকে ২০ দিন ওমঘর ঘরে তারপর ফসল উৎপাদনের জন্য চাষঘরে ২১ দিন থেকে ৪৫ দিন। ওমঘর ব্যবস্থাপনা এবং চাষঘর ব্যবস্থাপনা তথা স্ব স্ব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণই হল এ চাষের মূল কৌশল। 
মাশরুম চাষা করতে বীজ, ধানের খড়, পাতলা পলিথিন ব্যাগ, ঝুলন- শিকা বা বাঁশ, ছিদ্রযুক্ত কালো পলিথিন সিট, ঘরের উষ্ণতা ও আদ্রর্তা পরিমাপের জন্য হাইগ্রোমিটার, ঘরের উষ্ণতা ও আদ্রর্তা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য হ্যান্ড সপ্রেয়ার, জীবাণুনাশক, ব্লেড বা ছোট ছুরি, বালতি, আনুসাঙ্গিক অন্যান্য উপকরণ। 
প্রয়োজনীয় উপকরণঃ ক. মাশরুমের বীজ বা স্পন।
খ. বেড বা মাদা তৈরির জন্য ধানের শুকনা খড়।
গ. বেডের স্তরে ও উপরে ব্যবহারের জন্য মিলের ছাঁট তুলা/শিমুল তুলা এবং ধানের কুড়া/ছোলার বেসন।
ঘ. খড় ভেজানোর জন্য ড্রাম বা মাটির বড় চাড়ি/গামলা।
ঙ. বেডের তলায় ও উপরে ব্যবহারের জন্য পলিথিন কাগজ।
চ. মাপ মতো বেড তৈরির জন্য একটি কাঠের তলাবিহীন বাক্স (১ মিটার ঢ৩০ সে.মি. ঢ ৩০ সে.মি. আয়তনের)।
মাশরুম উৎপাদন পদ্ধতি: বীজ প্যাকেট প্রস-তকরণ; সাদা মাইসেলিয়াম সমৃদ্ধ মাশরুমের বীজ প্যাকেটের মুখ বন্ধ থাকলে রাবার ব্যান্ড, কাগজ, তুলা ও প্লাস্টিক নেক খুলে আলাদা করে আবার প্যাকেটের মুখটি শুধু রাবার ব্যান্ড দিয়ে পেচিয়ে ভালভাবে আটকাতে হবে; তারপর কম্পোস্ট প্যাকেটের উপরের দুপাশে (বিপরীত দিকে) ব্লেড দিয়ে গোলাকার বা চোখের আকৃতি করে ৩-৪ সে.মি. পলিথিন ব্যাগ কেটে ফেলতে হবে; কাটা অংশে চা চামচ দিয়ে ১ সে.মি. গভীর করে কম্পোস্ট চেঁছে ফেলতে হবে। এ ব্যবস্থাকে মাশরুম উৎপাদনের জন্য উদ্দিপ্তকরণ বলে; কম্পোস্ট প্যাকেট গুলো এবার একটি সুবিধামত পাত্রে পরিষ্কার পানিতে ৩০ মিনিট পর্যন- ডুবিয়ে রাখতে হবে; পানির পাত্র থেকে প্যাকেটগুলো উঠিয়ে পরিষ্কার স্থানে ৩০ মিনিট পর্যন- উল্টো করে রাখতে হবে যাতে প্যাকেটের বাড়তি পানি ঝরে পড়ে; এখন কম্পোস্ট প্যাকেটগুলো মাশরুম চাষের জন্য প্রস্তুত হল। মাশরুম উৎপাদনের ঘরে মাচার উপর প্রয়োজন অনুযায়ী একটি ভেজা পলিথিন পেতে উক্ত কম্পোস্ট প্যাকেটগুলো মাচার উপর রাখতে হবে এবং আর একটি পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। 
পলিথিন দিয়ে প্যাকেটগুলোকে ২-৩ দিন ঢেকে রাখতে হবে। তবে প্রতিদিন সকাল-দুপুর-বিকেল মোট ৩ বার প্যাকেটের উপরের ঢাকনা ১০ মিনিট পর্যন- সরিয়ে রাখতে হবে যেন এ সময় বাতাস চলাচল করতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পলিথিনের উপরে হালকাভাবে পানি সপ্রে করতে হবে, অথবা ঘরের ভেতরের চারপাশে চট ভিজিয়ে রাখা যেতে পারে। 
মাশরুম উঠানোর পর গোড়া থেকে ১-২ সে.মি. মত কেটে বোঁটাসহ ছিদ্রযুক্ত পলিথিন ব্যাগে বাজারজাত করা ভাল। তবে বিশ্বাসযোগ্যতা ও দূষণমুক্ত রাখার জন্য পলিথিন প্যাকেটের মুখ বন্ধ করে বাজারজাত করা দরকার। সাধারণ তাপমাত্রায় মাশরুম ১২-১৫ ঘন্টা ভাল থাকে। ফ্রিজের সবজি রাখার স্থানে রাখলে ৩-৪ দিন পর্যন- ভাল থাকে। তবে এ মাশরুম রোদে শুকিয়ে অনেকদিন রাখা যায়। মাশরুম উঠানোর পর সুন্দর করে বোঁটা কেটে রোদে প্রতিদিন ৭-৮ ঘন্টা করে ৩-৪ দিন শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে ১ বছর পর্যন- শুকনো মাশরুম ভাল থাকে। 
মাশরুম চাষ পদ্ধতির আরো কিছু টিপস >> পরিমাণমত শুকনো পরিষ্কার ধানের খড় সংগ্রহ করে পানিভর্তি ড্রামের মধ্যে কিংবা মাটির বড় চাড়ির মধ্যে ভালোভাবে নেড়েচেড়ে ভিজিয়ে নিন।
>> ভেজানো খড়গুলো একটা ঝুড়িতে রেখে অতিরিক্ত পানি বের হতে দিন।
>> এবার ভেজা খড়গুলো একটা পরিথিন কাগজের ওপর স্তূপ করে রেখে তার ওপর আরেকটি পলিথিন কাগজ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে ২৪ ঘণ্টা রেখে দিন।
>> পরিমাণমত শিমুল তুলা কিংবা মিলের পরিত্যক্ত তুলা একটি পাত্রে ভিজিয়ে রাখুন।
>> যে ঘরে বা স্থানে মাশরুম চাষ করা হবে সে জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে মেঝেতে পলিথিন বিছিয়ে দিন।
>> এক মিটার লম্বা, এক মিটার চওড়া এবং ৩০ সি.মি. উঁচু তলাবিহীন কাঠের ফরমা বা বাক্সটি পলিথিন বিছানো কাগজের ওপর রাখুন।
>> এখন কাঠের ফরমার মধ্যে সমানভাবে ভিজা খড় একটু চাপ দিয়ে সাজাতে থাকুন যেন বিছানো খড়ের স্তর ৮-১০ সে.মি. পুরু বা উঁচু হয়।
>> চারদিকে খড়ের স্তূপের কিনার থেকে ৫ সে.মি. ছেড়ে এক সে.মি. পুরু ও ৫ সে.মি. চওড়া করে ভিজা তুলা ঠিকমত বিছিয়ে দিন।
>> বীজ ছিটানোর পর একই নিয়মে আবার ৮-১০ সে.মি. করে খড় বিছিয়ে ২য় স্তর তৈরি করে একইভাবে তুলা বিছিয়ে তাতে মাশরুম বীজ ছড়িয়ে দিন।
>> এরপর একইভাবে ৩য় স্তর তৈরি হলে বেডের উপরের সব অংশে তুলা ছড়িয়ে তার ওপর মাশরুম বীজ বুনে আবার হালকাভাবে সামান্য খড় ছিটানোর পর বাক্সটি ভরে গেলে সাবধানে তুলে নিন।
>> একই নিয়মে পাশাপাশি ১০ সে.মি. ফাঁকে ফাঁকে একটির পর একটি বেড প্রয়োজনমত বসাতে থাকুন।
>> প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাজানো শেষ হলে বেডগুলো পলিথিন কাগজ অথবা চট দিয়ে ঢেকে দিন।
মাশরুমের পরিচর্যা >> মাশরুম বেডে বীজ বপনের পর থেকে গজানোর আগ পর্যন্ত তাপমাত্রা ৩৫ক্র-৪৫ক্র সে.-এর মধ্যে রাখা দরকার এবং মাশরুম গজাতে শুরু করলে তাপমাত্রা ৩০ক্র-৩৫ক্র সে.-এর মধ্যে রাখতে হবে।
>> পলিথিন দ্বারা ভালোভাবে ঢেকে তাপ বাড়ানো এবং খুলে দিয়ে তাপ কমানো যায়। কাজেই অবস্থার প্রেক্ষিতে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
>> মাশরুম বেডকে পোকা-মাকড় ও জীব-জন্তুর উপদ্রব থেকে রক্ষা করুন।
>> মাশরুম বেড সব সময় ভেজা থাকা দরকার। বেডের উপরিভাগ শুকিয়ে গেলে মাঝে মাঝে হালকাভাবে পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
মাশরুম সংগ্রহ >> মাশরুম বেডে বীজ বপনের ১০-১৫ দিনের মধ্যে আলপিনের মাথার আকারে মাশরুম গজানোর লক্ষণ দেখা যায়। মাত্র ২ দিনের মধ্যে এ অবস্থা পেরিয়ে মাশরুম দেশীয় মুরগির ডিমের আকার ধারণ করে। এ অবস্থা মাশরুম সংগ্রহের উপযুক্ত সময়।
>> সংগ্রহে বিলম্ব হলে মাশরুম ছাতার মতো হয়ে ফুটে যায় এবং এর স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। কাজেই সময়মত মাশরুম সংগ্রহ করা আবশ্যক।
>> একটা বেড থেকে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত দফায় দফায় মাশরুম সংগ্রহ করা যায়।
>> মাশরুম সংগ্রহ শেষ হলে বেডের সব আবর্জনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সেখানে পরের বারের জন্য মাশরুম চাষের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
মাশরুম সংরক্ষণ >> মাশরুম তাজা অবস্থায় খাওয়া উত্তম।
>> পলিথিন ব্যাগে সাধারণভাবে মাশরুম ১০-১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে।
>> রিফ্রিজারেটরে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত মাশরুম অনায়াসে সংরক্ষণ করা যায়।
>> রোদে শুকিয়ে নিয়ে মাশরুম দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা যায়।
>> রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট টিনে বহুদিন ধরে সংরক্ষণ করে খাওয়া চলে।
অন্য তথ্যাবলী >> ৫ মিটার লম্বা ও ৪ মিটার চওড়া ঘরের মেঝেতে পূর্বে বর্ণিত পরিমাপের ৩০টি বেডে একত্রে মাশরুম চাষ করা যায়।
>> তাক বা র্যাক তৈরি করে তাতে চাষ করলে এ সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি করা যায়।
>> প্রতি বেডে গড়ে এক কেজি ’স্ট্র’ জাতের মাশরুম ফলে।
>> বেড প্রতি ৩-৪ কেজি খড়, ২০০ গ্রাম তুলা এবং ১০০-১৫০ গ্রাম মাশরুম বীজের প্রয়োজন হয়।
>> বীজ বপন থেকে শুরু করে মাশরুম সংগ্রহ পর্যন্ত একটা ফসল চক্র শেষ হতে সর্বমোট ২০ দিন সময় লাগে। অন্য কোনো সবজি এত তাড়াতাড়ি পাওয়া সম্ভব নয়।
>> এক কেজি মাশরুম উত্পাদনে খরচ হয় প্রায় ১০০ টাকা।
>> ৫ মিটার ঢ৪ মিটার আয়তনের একটা ঘরে বাঁশের তাক তৈরি করে (৩০×৪) ১২০টি বেডে মাশরুম চাষ করে প্রতি ২০ দিনে ১২০ কেজি মাশরুম উত্পাদন করা সম্ভব হবে। উত্পাদিত মাশরুম প্রতি কেজি বর্তমান বাজার মূল্য ২০০ টাকায় বিক্রি করলে (২০০ টাকা × ১২০টি বেড)=২৪,০০০ টাকা পাওয়া যাবে, যা থেকে ১২,০০০ টাকা খরচ বাদ দিয়ে ১২০০০ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।
মাশরুমে রোগ-বালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ অনেক কম। শুধু খড়ের বেড তৈরির সময় আগাছা বাছাই করে ফেললে আগাছার প্রকোপ থাকবে না। আর মাছিপোকা ও তেলাপোকা দমনের জন্য আঠার ফাঁদ, নকরোচ ব্যবহার করলেই চলে। 
মাশরুম দিয়ে মাশরুম ফ্রাই, আমিষ সমৃদ্ধ সু্যপ, মাশরুম চিকেন সু্যপ, মাশরুম চিংড়ি, মাশরুম স্যান্ডউইচ, মাশরুম সস, মাশরুম পোলাও ও মাশরুম ওমলেট তৈরি করা যায়। 
বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মাশরুম খাদ্য হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করছে। কারণ, মাশরুমে অনন্য শাকসবজি ও ফলের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি আমিষ থাকায় উন্নত বিশ্বের লোকেরা একে সবজি মাংস হিসেবে অভিহিত করে। তাছাড়া রোগমুক্ত স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত মাশরুম রাখতে হবে আমাদের খাবার তালিকায়। 

মাটিবিহীন চাষবাস

মাটিবিহীন চাষবাস
একবার ভাবুন তো! গাছ আছে, ফল আছে, ফুল আছে আপনার প্রিয় আঙিনায়; কিন্তু গাছের নিচে মাটি নেই। ভাবছেন, ধ্যাৎ এটা আবার হয় নাকি! মাটি ছাড়া তো গাছ থাকবেই না। হ্যাঁ, এবার থেকে আপনার প্রিয় আঙিনায় মাটি ছাড়াই জন্মাবে প্রিয় ফসল, ফুল ও সবজি। মাটির পরিবর্তে পানিতেই অবলীলায় জন্মাতে পারবেন টমেটো, লেটুস, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শসা, ক্ষীরা, ক্যাপসিকাম, স্ট্রবেরি, অ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা আরো কত ফসল। মাটিবিহীন পানিতে ফসল উৎপাদনের এ কৌশলকে বলে হাইড্রোপনিক, যা একটি অত্যাধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে সারাবছরই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব। এখন থেকে যেখানে স্বাভাবিক চাষের জমি কম কিংবা নেই সেখানে বাড়ির ছাদে, আঙ্গিনায়, বারান্দা, খোলা জায়গায় পলি টানেল, টব, বালতি, জগ, বোতল, পাতিল, প্লাস্টিকের ট্রে, নেট হাউসে হাইড্রোপনিক, পদ্ধতিতে অনায়াসে সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদন করতে পারবে বাংলাদেশের কৃষক থেকে শুরু করে শৌখিন সম্প্রদায়। এই চাষাবাদে কোনো কীটনাশক বা আগাছানাশক কিংবা অতিরিক্ত সার দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তাই অনায়াসে গড়ে তুলতে পারবেন অরগানিক ফসলের সম্ভার। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ কে এম সেলিক রেজা মল্লিক ১৯৯৭ সালে জাপানে হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এ প্রযুক্তি প্রথম বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ২০০৬ সালে। ২০০৭ সালে তিনি বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হাইড্রোপনিক প্রযুক্তির গবেষণা শুরু করেন টমেটো, ক্যাপসিকাম, লেটুস ও স্ট্রবেরি এই চারটি ফসল নিয়ে। এ গবেষণায় সাফল্যের পর ২০০৮ সালে এর সঙ্গে ক্ষীরা, শসা, গাঁদা ফুল ও বেগুন এবং ২০০৯ সালে বামন শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, চন্দ্রমল্লিকা যোগ করেন। বিজ্ঞানী মল্লিক এ গবেষণায় ব্যাপকভাবে সাফল্য পান। বিজ্ঞানী এ কে এম সেলিক রেজা মল্লিক জানান, লাভজনক ফসলের ক্ষেত্রে এই হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাটির পরিবর্তে পানিতে গাছের প্রয়োজনীয় খাবার সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন করা হয়। জনবহুল দেশে যেখানে স্বাভাবিক চাষের জমি কম কিংবা নেই সেখানে ঘরের ছাদে বা আঙ্গিনায়, পলি টানেল, নেট হাউসে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে সবজি ও ফল উৎপাদন সম্ভব। উন্নত বিশ্বের যেমন ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, তাইওয়ান, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাণিজ্যিকভাবে এর মাধ্যমে সবজি ও ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে সারাবছরই সবজি ও ফল উৎপাদন করা সম্ভব এবং উৎপাদিত সবজি ও ফলে কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বিধায় এ সবজি ও ফল নিরাপদ এবং অধিক বাজারমূল্য পাওয়া যায়।
সাধারণত দুই উপায়ে হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যায়
১. সঞ্চালন পদ্ধতি এবং
২. সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতি 
সঞ্চালন পদ্ধতিতে গাছের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো যথাযথ মাত্রায় মিশ্রিত করে একটি ট্যাংকিতে নেয়া হয় এবং পাম্পের সাহায্যে পাইপের মাধ্যমে ট্রেতে পুষ্টি দ্রবণ সঞ্চালন করে ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রতিদিন অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পাম্পের সাহায্যে এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া চালু রাখা দরকার। এই পদ্ধতিতে প্রাথমিকভাবে প্রথম বছর ট্রে, পাম্প এবং পাইপের আনুষঙ্গিক খরচ একটু বেশি হলেও পরবর্তী বছর থেকে শুধু রাসায়নিক খাদ্য উপাদানের খরচ প্রয়োজন হয়। ফলে দ্বিতীয় বছর থেকে খরচ অনেকাংশে কমে যাবে। এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজিং লোহার ট্রের ওপর কর্কশিটের মধ্যে গাছের প্রয়োজনীয় দূরত্ব অনুসারে যেমন- লেটুস ২০×২০ সেন্টিমিটার টমেটো ৫০×৪০ সেন্টিমিটার এবং স্ট্রবেরি ৩০×৩০ সেন্টিমিটার দূরত্বে গর্ত করতে হয়। উপযুক্ত বয়সের চারা স্পঞ্জসহ ওই গর্তে স্থাপন করতে হয়।
অপরদিকে, সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে একটি ট্রেতে গাছের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানগুলো পরিমিত মাত্রায় সরবরাহ করে সরাসরি ফসল চাষ করা হয়। এ পদ্ধতিতে খাদ্য উপাদান সরবাহের জন্য কোনো পাম্প বা পানি সঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে খাদ্য উপাদান মিশ্রিত দ্রবণ ও এর ওপর স্থাপিত কর্কশিটের মধ্যে ২-৩ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে এবং কর্কশিটের ওপরে ৪-৫টি ছোট ছোট ছিদ্র করে দিতে হবে, যাতে সহজেই বাতাস চলাচল করতে পারে এবং গাছ তার প্রয়োজনীয় অক্সিজেন কর্কশিটের ফাঁকা জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে পারে। ফসলের প্রকারভেদে সাধারণত ২-৩ বার এই খাদ্য উপাদান ট্রেতে যোগ করতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সহজেই এ পদ্ধতি অনুসরণ করে প্লাস্টিক বালতি, পানির বোতল, মাটির পাতিল ইত্যাদি ব্যবহার করে বাড়ির ছাদ, বারান্দা এবং খোলা জায়গায় সঞ্চালনবিহীন পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদন করতে পারে। এতে খরচ তুলনামূলক অনেক কম হবে।
যেসব ফসল হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা যাবে তা হলো- পাতা জাতীয় সবজির মধ্যে লেটুস, গিমাকলমি, বিলাতি ধনিয়া, বাঁধাকপি। ফল জাতীয় সবজির মধ্যে টমেটো, বেগুন, ক্যাপসিকাম, ফুলকপি, শসা, ক্ষীরা, মেলন, স্কোয়াস, ফল স্ট্রবেরি, ফুল অ্যানথরিয়াম, গাঁদা, গোলাপ, অর্কিড, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চারা উৎপাদন প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী মলিক বলেন, হাইড্রোপনিকস পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনের জন্য স্পঞ্জ ব্লক ব্যবহার করা হয়। সাধারণত স্পঞ্জকে ৩০ সেন্টিমিটার × ৩০ সেন্টিমিটার সাইজে কেটে নিতে হয়। এই স্পঞ্জকে ২.৫ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ২.৫ সেন্টিমিটার প্রস্থ বর্গাকারে, ডট ডট করে কেটে নিতে হয় এবং এর মাঝে ১ সেন্টিমিটার করে কেটে প্রতিটি বর্গাকারে স্পঞ্জের মধ্যে একটি করে বীজ বপন করতে হয়। বীজ বপনের আগে বীজকে ১০ শতাংশ ক্যালসিয়াম অথবা সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। বীজ বপনের পর স্পঞ্জকে একটি ছোট ট্রেতে রাখতে হবে। এই ট্রের মধ্যে ৫-৮ সেন্টিমিটার পানি রাখতে হবে যাতে স্পঞ্জটি পানিতে সহজে ভাসতে পারে। চারা গজানোর ২-৩ দিন পর প্রাথমিক অবস্থায় ৫-১০ মিলিলিটার খাদ্যোপাদানে সংবলিত দ্রবণ একবার এবং চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর থেকে চারা রোপণের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ১০-২০ মিলিলিটার দ্রবণ দিতে হবে। 
এ পদ্ধতিতে চারা রোপণের পর দ্রবণের পিএইচ (অম্ল) মাত্রা ৫.৮ থেকে ৬.৫-এর মধ্যে এবং ইসি (ক্ষার) মাত্রা ১.৫ থেকে ১.৯-এর মধ্যে রাখা দরকার। গাছের বৃদ্ধির পর্যায়ে ওপর থেকে সুতা বা শক্ত রশি ঝুলিয়ে গাছ সোজা ও খাড়া রাখতে হয় এবং পরিচর্যা সাধারণ গাছের মতোই করতে হবে।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির জন্য রাসায়নিক দ্রব্যের পরিমাণ ও তৈরির প্রক্রিয়া একটু ভিন্ন রকম। প্রতি ১ হাজার লিটার পানির জন্য পটাশিয়াম হাইড্রোজেন ফসফেট ২৭০ গ্রাম, পটাসিয়াম নাইট্রেট ৫৮০ গ্রাম, ক্যালসিয়াম নাইট্রেট ১ হাজার গ্রাম, ম্যাগানেসিয়াম সালফেট ৫১০ গ্রাম, ইডিটিএ আয়রন ৮০ গ্রাম, ম্যাঙ্গানিজ সালফেট ৬.১০ গ্রাম, বরিক এসিড ১.৮০ গ্রাম, কপার সালফেট ০.৪০ গ্রাম, অ্যামনিয়াম মলিবটেড ০.৩৮ গ্রাম, জিংক সালফেট ০.৪৪ গ্রাম হারে পানিতে মিশিয়ে খাদ্য দ্রবণ তৈরি করতে হবে। 
জলীয় খাদ্য দ্রবণ তৈরির সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমে স্টোক সলিউসান তৈরি করতে হবে। এই স্টোক তেরি করার সময় ক্যালসিয়াম নাইট্রেট- কে পরিমাপ করে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে দ্রবণকে স্টোক সলিউসান ‘এ’ নামে নামকরণ করতে হবে। অবশিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্যগুলোকে একসঙ্গে ১০ লিটার পানিতে দ্রবীভূত করে স্টোক সলিউসান ‘ বি’ নামে নামকরণ করতে হবে। ১ হাজার লিটার জলীয় দ্রবণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে ১ হাজার লিটার পানি ট্যাংকে নিতে হবে। তারপর স্টোক সলিউসান ‘এ’ থেকে ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকের পানিতে ঢালতে হবে এবং একটি অধাতব দন্ডের সাহায্যে নাড়াচাড়া করে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এরপর স্টোক সলিউসান ‘ বি’ থেকে আগের মতো ১০ লিটার দ্রবণ ট্যাংকে নিতে হবে এবং আগের মতো অধাতব দন্ডের সাহয্যে পানিতে স্টোক সলিউসান গুলো সমানভাবে মেশাতে হবে।
হাইড্রোপনিক পদ্ধতির চাষাবাদের সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মো. আব্দুল হক প্রতিবেদককে জানান, হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে আবাদি জমির প্রয়োজন হয় না বিধায় সারাবছর কিংবা অমৌসুমেও সবজি, ফল, ফুল চাষাবাদ করা যায়। পদ্ধতিটি মাটিবিহীন চাষ পদ্ধতি হওয়ায় মাটিবাহিত রোগ ও কৃমিজনিত রোগ হয় না। কীটপতঙ্গের আক্রমণ কম হওয়ার কারণে এই পদ্ধতিতে কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদন করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে ছোট এবং বড় পরিসরে স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিচ্ছন্নভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়। এটি হোম-ফার্মিংয়ের জন্য একটি আদর্শ প্রযুক্তি বিধায় অধিক লাভজনক, অর্থকরী ও মানসম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। 
প্রতিদিন কমছে ২২০ হেক্টর চাষযোগ্য জমি। ফসলের মাঠে শিল্প আর শিল্পের জায়গায় হচ্ছে আবাসন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতভিটা তৈরি, অপরিকল্পিত চাষাবাদ, যোগাযোগের জন্য রাস্তা ও শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের কারণে দেশে মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমাণ সঙ্কুচিত হচ্ছে। বর্ধিত জনসংখ্যার অব্যাহত খাদ্য চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তাই শুধু আবাদি জমির ওপর নির্ভর করা যাবে না। দেশের এমনি অবস্থায় প্রয়োজন অব্যবহৃত খালি জায়গা ও পতিত স্থান শষ্য চাষের আওতায় আনা। হাইড্রোপনিকস চাষ পদ্ধতি এক্ষেত্রে সঠিকভাবে আরোপযোগ্য একটি কৌশল। এ পদ্ধতি বাড়ির ছাদে, আঙ্গিনায়, বারান্দায় কিংবা চাষের অযোগ্য পতিত জমিতে সহজেই চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব। এতে করে একদিকে যেমন পতিত জমি বা অব্যবহৃত জায়গার সফল ব্যবহার হবে, অন্যদিকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হবে।
লেখক : গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস, কৃষিবিদ,
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাফল গবেষণা কেন্দ্র, বিনোদপুর, রাজশাহী
তথ্যসূত্র: দৈনিক ডেসটিনি
ভাসমান চাষাবাদ
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকা প্রতি বছর বর্ষাকালে প্লাবিত হয়। কয়েক শতাব্দীকাল থেকে এসব এলাকার মানুষ এই আবহাওয়ার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এসব মানুষ প্রধানত কৃষিজীবী। আর তাই জীবিকার তাগিদে তাদের পূর্বপুরুষরা মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে উদ্ভাবন করেছেন ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি। মূলত বর্ষাকালে সহজলভ্য কচুরিপানা দিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে সেখানেই চলে প্রচলিত এই চাষাবাদ। প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে বেঁচে থাকার জন্য চলে এত সব আয়োজন। 
স্খানীয়ভাবে এই ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি বায়রা, গেটো বা ধাপ চাষাবাদ নামে সুপরিচিত। গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, নড়াইল, যশোর, বরিশাল, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, ঝালকাঠি জেলা ও উপকূলীয় অন্যান্য এলাকায় বর্ষা মৌসুমে এই ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর-বাঁওড় অঞ্চলে লাভজনক ভাসমান চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগের বিলঝিল ও বর্ষাকালে সারা দেশের জলাবদ্ধ অঞ্চলগুলোতে এটি বিকল্প চাষাবাদের লাগসই প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। বর্তমানে দেশে দুই হাজার ৫০০ হেক্টর জলাভূমিতে ভাসমান চাষাবাদ করা হচ্ছে। শুধু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুই লাখ হেক্টর প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম জলাভূমি রয়েছে যার ৫০ হাজার হেক্টর এলাকা সফলভাবে ভাসমান চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দীঘি প্রভৃতি জলাশয় এবং বর্ষাকাল ও বন্যার সময় জলমগ্ন কৃষিজমিতে সফলভাবে ভাসমান চাষাবাদ করা যায়। 
বায়রা বা বেড তৈরির পদ্ধতি : ভাসমান চাষাবাদের জন্য প্রধানত কচুরিপানা ব্যবহার করা হয়। তবে হোগলা, সোলা, নলখাগড়া, বিভিন্ন ধরনের জলজ আগাছা, ধানের খড়, নাড়া, তুষ প্রভৃতিও ব্যবহার করা যায়। জমি থেকে ধান কাটার পর গাছের যে অবশিষ্ট অংশ জমিতে থেকে যায় তাকে নাড়া বলে। এসব নাড়া সংগ্রহ করে রাখা হয় বর্ষাকালে বেড তৈরির জন্য। মে-জুন মাসে নিকটবর্তী নদী বা খাল থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে কচুরিপানা দিয়ে একটি লেয়ার তৈরি করে ৭-১০ দিন রেখে দেয়া হয়। এরপর আবার নাড়া বা কচুরিপানা দিয়ে আরেকটি লেয়ার তৈরি করা হয়। এর ওপর অনেক সময় কাদামাটি ও গোবরের একটি আস্তর দেয়া হয়। পুরো বেড তৈরি করে ফসল লাগাতে ১৮-২০ দিন সময় লাগে। এসব বেডের কোনো সুনির্দিষ্ট আকার নেই, তবে ছোট আকারের বেডের ব্যবস্খাপনা সহজ হয় এবং ফলনও তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। স্খানীয় পর্যায়ে ৮-১৫ মিটার লম্বা, ১.৫-২.০ মিটার প্রশস্ত এবং ০.৬-১.০ মিটার গভীর বেড ব্যবহার করা হয়। এসব ভাসমান বেড আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি দ্বীপ পদ্ধতি অন্যটি স্খায়ী ভাসমান পদ্ধতি। সাধারণত স্খির পানিতে দ্বীপ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যাতে বেডটি মুক্তভাবে পানিতে ভাসতে থাকে। আর প্রবহমান পানিতে স্খায়ী ভাসমান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যাতে বেডটিকে খুঁটির সাহায্যে বেঁধে রাখা হয়। 
ভাসমান চাষাবাদের সুবিধা : পতিত জলাবদ্ধ জমির চাষের আওতায় এনে মোট চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বাড়ানো যায়। প্রচলিত চাষের জমি থেকে ভাসমান বেডগুলো অনেক বেশি উর্বর তাই ফলনও হয় বেশি। এ পদ্ধতিতে কোনো প্রকার সার বা সেচের প্রয়োজন হয় না। চাষ শেষে বেডটি জৈবসার হিসেবে রবি মৌসুমে জমিতে প্রয়োগ করা যায়। বর্ষা মৌসুমে বা জলাবদ্ধ অবস্খায় প্রয়োজনীয় সবজির চাহিদা পূরণ করা যায়। অরক্ষিত প্রান্তিক দরিদ্র মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে। বন্যার সময় ধান ও সবজির বীজতলা তৈরি করে মৌসুমি উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। এ ছাড়া বন্যার সময় এসব বেড হাঁস-মুরগির আশ্রয়স্খল হিসেবে ব্যবহার হয়। এ পদ্ধতিতে জেলেরা একই সাথে ফসল ও মৎস্যচাষ করতে পারে। এটি একটি পরিবেশবাìধব চাষাবাদ পদ্ধতি, যাতে অর্গানিক ফসল চাষ করা যায়। নিুাঞ্চলের মানুষের জন্য বিকল্প জীবিকার সংস্খান করে। ক্ষতিকর জলজ আগাছা কচুরিপানার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচনে এটি একটি লাগসই প্রযুক্তি। 
চাষোপযোগী ফসল : এসব ভাসমান বেডে মূলত শাকসবজি চাষ করা হয়। প্রায় ২৩ ধরনের শাকসবজি ও মসলা চাষ করা যায়। বর্ষাকালে চাষযোগ্য ফসলগুলো হলোন্ধ ঢেঁড়স, মিষ্টিকুমড়া, শসা, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, করলা, ঝিঙে, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক, কলমিশাক, কচু, বেগুন প্রভৃতি। আবার শীতকালে শিম, বরবটি, লাউ, আলু, টমেটো, মুলা, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ প্রভৃতি চাষ করা যায়। কিছু কিছু ফসল সারা বছর ধরেও চাষ করা যায়। মৌসুমি বন্যায় বর্ষাকালীন ফসল চাষের পর শীতকালীন ফসল লাগিয়ে দেয়া হয়। বর্ষা শেষে পানি শুকিয়ে গেলে বেডটি মাটিতে স্খায়ী হয় এবং বিনা চাষে রবি ফসল ফলানো যায়। অথবা বেডটি ভেঙে জমিতে মিশিয়ে দেয়া হয় ফলে কোনো প্রকার রাসায়নিক সার ছাড়াই রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদন করা যায়। এ ছাড়া আগাম মৌসুমি বন্যায় ভাসমান বেডে আমন ধানের বীজতলা তৈরি করা যায় এবং বন্যার পানি সরে যাওয়ার সাথে সাথে চারা লাগিয়ে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। ভাসমান বেডে মূলত বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করা হলেও প্রতিকূল পরিবেশে ধানের বীজতলা ও নার্সারি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। 
বেড ব্যবস্খাপনা : একটি ভাসমান বেডে এক বছর ফসল চাষ করা যায়। বেডে সরাসরি বীজ লাগানো যায়, তবে অনেক সময় আরেকটি ভাসমান পিটে (যা স্খানীয়ভাবে টেমা নামে পরিচিত) চারা তৈরি করে পরে পিটটি বেডে স্খানান্তর করা হয়। ভাসমান চাষ পদ্ধতিতে কৃষককে কোনো প্রকার সার বা সেচ প্রদান করতে হয় না। তবে অনেক সময় পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব দেখা যায়। এ ছাড়া বেডে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে লাগানো বীজ নষ্ট হয়ে যায়। এসব বেডে গাছের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকায় বেশ ঘন করে ফসল লাগানো হয়। গভীর পানিতে বেড তৈরি করলে বেডের আন্ত:পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহের জন্য নৌকার প্রয়োজন হয়। ভাসমান বেডে শাকসবজি চাষ বেশ লাভজনক। বর্ষাকালে এমনিতেই শাকসবজির দাম বেশি থাকে। আবার ভাসমান বেডে তৈরি হওয়া জৈব সারের কারণে জমিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি ফলন পাওয়া যায়। এ ছাড়া এসব বেডে রবি মৌসুমের জন্য আগাম বীজতলা তৈরি করা যায় ও আগাম ফসল তুলে অধিক মুনাফা পাওয়া যায়। 
শেষ কথা : বাংলাদেশে ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস ৩০০ থেকে ৪০০ বছরের পুরনো। আমাদের সংগ্রামী পূর্বপুরুষরা জীবিকার প্রয়োজনে তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে চাষের এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। অথচ এজাতীয় হাইড্রোপনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ভবিষ্যতের চাষাবাদ পদ্ধতি হিসেবে এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। এটা আমাদের সমৃদ্ধ জাতিসত্তার প্রমাণ বহন করে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রতি বছর এক শতাংশ হারে আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। আবার অন্য দিকে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ। সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন সাময়িক ও দীর্ঘস্খায়ী বন্যা, দীর্ঘমেয়াদি বর্ষাকাল, উপকূলীয় এলাকার জলাবদ্ধতা প্রভৃতি প্রচলিত কৃষিব্যবস্খার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এ অবস্খায় প্রতিকূল পরিবেশের সাথে চাষাবাদ পদ্ধতিকে অভিজোযিত করা একান্ত প্রয়োজন। ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর-বাঁওড়, পুকুর-দীঘি ও উন্মুক্ত জলাশয় মৎস্য চাষের পাশাপাশি ফসল চাষের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। তাই ফসল চাষের আওতা বৃদ্ধি করা এবং বছরজুড়ে এমনকি প্রতিকূল পরিবেশেও ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য ভাসমান চাষাবাদ পদ্ধতি নি:সন্দেহে একটি চমৎকার লাগসই বিকল্প। 

পাট পচানো আধুনিক পদ্ধতি


পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে পাট পচানো
বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে পাটের প্রচুর চাষ হয়, সেসব অঞ্চলে পাট সংগ্রহের সময় পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ভালো মানের পাটের আঁশ পাওয়া সম্ভব হয় না। অবশ্য পচনের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকা অঞ্চলেও যথাযথভাবে পাট না পচানোর ফলে পাটের আঁশের মান ভালো হয় না। সে জন্য চাষিরাও ভালো দাম পান না। পাট সংগ্রহের পর এর পচন প্রক্রিয়া বা জাগ দেয়া তিনভাবে করা যেতে পারে।
১. যে এলাকার পানি বেশ পরিষ্কার এবং হালকা স্রোত আছে এমন জলাশয়ে (যেমনন্ধ বিল বা খালে) পাটগাছ পচানো।
২. রিবন রেটিং পদ্ধতিতে কাঁচা পাটের ছাল ছাড়িয়ে বড় চাড়ি বা পাত্রে পাট পচানো।
৩. মিনি পুকুর বা গর্ত তৈরি করে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট থেকে ছাড়ানো ছাল পচানো।
প্রথম পদ্ধতিতে পাট পচানোর আগে কাটা পাটগাছ ছোট-চিকন ও বড়-মোটা হিসেবে বাছাই করা দরকার। কারণ চিকন গাছের ছাল পাতলা তাই দ্রুত পচে এবং মোটা গাছের ছাল পুরু তাই দেরিতে পচে। এরপর বাছাই করা গাছগুলোকে ১০ কেজি ওজনের সমান করে আঁটি বাঁধতে হয়। আঁটি কখনোই শক্ত করে বাঁধতে হয় না। তাতে ভেতরের পাটগাছে পানি সহজে ঢুকতে পারে না বলে পচতে সময় বেশি লাগে বা কখনো কখনো পানির সংস্পর্শে আসে না বলে পচেই না। শক্ত করে বাঁধা আঁটির ভেতরে পাট পচনকারী জীবাণু বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া ঢুকতে পারে না। দুই ধরনের আঁটিগুলোকে আলাদা জাগ দিতে হয়। জাগের ওপরে কখনোই মাটি বা কলাগাছজাতীয় কিছু দিয়ে পানির নিচে ডুবানোর ব্যবস্খা করা ঠিক নয়। এতে পাটের আঁশের রঙ নষ্ট হয়।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কাঁচা পাটের ছাল ছাড়িয়ে সেগুলো গোলাকার মোড়া বেঁধে বড় মাটির চাড়ি বা বড় পাত্রে সাজিয়ে পরিষ্কার পানি দিয়ে চাড়িটি ভরে দিতে হয়। এ রকম একটি বড় চাড়িতে প্রায় ৩০ কেজি ছাল পচানো যায়। 
কম গভীরতাসম্পন্ন ছোট ডোবা বা পুকুর বা খালের পানিতে কাঁচা পাট থেকে ছাড়ানো ছাল গোলাকার করে মোড়া বেঁধে লম্বা বাঁশে ঢুকিয়ে বা ঝুলিয়ে পানিতে ডুবিয়ে দিতে হয়। বাঁশটি ডুবানোর জন্য দু’টি বাঁশের খুঁটি ডোবা, পুকুর বা খালের পানিতে দুই পাশে পুঁতে দিয়ে পাটের ছালের মোড়াসহ লম্বা বাঁশটি পানির নিচে বেঁধে দিতে হয়। এভাবে পচানো পাটের আঁশের মান বেশ ভালো হয়। 
তৃতীয় পদ্ধতিতে বাড়ির আশপাশে বা ক্ষেতের পাশে ৫ মিটার লম্বা ও ২ মিটার চওড়া এবং ১ মিটার গভীর গর্ত খুঁড়ে গর্তের নিচ থেকে চার দিকের দেয়াল পলিথিন দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। এরপর পরিষ্কার পানি দিয়ে গর্তটি ভর্তি করে সেখানে কাঁচা পাটগাছ থেকে ছাড়ানো ছাল রেখে দিতে হয়। যদি পাওয়া যায় তাহলে কচুরিপানা দিয়ে ছালের মোড়াগুলো ঢেকে দেয়া যেতে পারে। এ পদ্ধতিকে পলিথিন ট্যাংক পদ্ধতি বলা হয়। পলিথিনের এ গর্তে কিছু পাট পচানো পানি দিলে দ্রুত পচন নিশ্চিত হয়। এ জন্য একটা ছোট হাঁড়িতে দুই থেকে তিনটি পাটগাছ কেটে টুকরো করে বা গাছের ছাল আগেই পচিয়ে নিয়ে পরে ওই পচা পানি ব্যবহার করা যায়।
পাটগাছ প্রথম পদ্ধতিতে পচানোর আগে কিছু কাজ করতে হয়। ক্ষেতে থেকে কাটার পর কাটা পাটগাছ তিন থেকে চার দিন ক্ষেতেই স্তূপ করে রাখলে পাতা ঝরে যায়। পাতাগুলো জমিতে ছড়িয়ে দিলে পচে ভালো সারের কাজ করে। এ সময়ের মধ্যে গাছগুলোও কিছুটা শুকিয়ে যায়। শুকানোর ফলে গাছগুলো পানিতে ডুবানোর সাথে সাথে বেশ পানি শুষে নেয়। এতে পচনপ্রক্রিয়া দ্রুত হয়। 
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদ্ধতিতে পাটগাছ থেকে ছাল ছাড়ানোর জন্য একটা পৌনে দুই মিটার লম্বা বাঁশ নিতে হয়। বাঁশের ওপরের দিকে আড়াআড়িভাবে কাটতে হয়, যাতে কাটা অংশটি দেখতে ‘ইউ’ বা হুকের মতো দেখায়। এরপর প্রয়োজনমতো উচ্চতা রেখে বাঁশের খুঁটির গোড়ার অংশ মাটিতে শক্ত করে পুঁতে দিতে হয়। এভাবে পাশাপাশি তিন থেকে চার ফুট পরপর প্রয়োজনমতো এমন কয়েকটি খুঁটি পোঁতা যেতে পারে। এরপর মাটিতে পোঁতা বাঁশের হুকগুলোর সাথে মাটির সমান্তরালে আরেকটি বাঁশ দিয়ে আড়া বাঁধতে হয়, যাতে জমি থেকে কেটে আনা পাটগাছ দাঁড় করিয়ে রাখা যায়। ওই পাটগাছগুলোর গোড়ার ৮ থেকে ১০ সেন্টিমিটার অংশ একটি শক্ত কাঠের বা বাঁশের গোড়া দিয়ে তৈরী হাতুড়ির সাহায্যে থেঁতলে দিতে হয়। 
থেঁতলানো পাটগাছের গোড়ার ছাল হাত দিয়ে দুই ভাগ করে হুকের দুই পাশে ও গাছের গোড়া হুকের ভেতরে ধরে জোরে টান দিলে পাটের ছাল পাটের কাণ্ড বা পাটখড়ি থেকে আলাদা হয়ে যায়। হাতে পাটের ছাল থেকে যায় এবং পাটখড়ি সামনের দিকে চলে যায়। এভাবে তিন থেকে চারটি পাটগাছের ছাল এক সাথে পাটখড়ি থেকে আলাদা করা যায়। পরে ছালগুলো গোল করে মোড়া বেঁধে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পদ্ধতিতে পচানো যায়। বর্তমানে বাঁশের বদলে লোহার যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে একই রকমের রিবনার যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। 
অনেক সময়ই আঁশ ছাড়ানোর পর দেখা যায়, গোড়ার দিকের কিছু ছাল আলাদা না হয়ে যুক্ত রয়ে গেছে। এই ছালযুক্ত অংশ পরে কেটে বাদ দিতে হয়। সমস্যাটি সহজেই দূর করা যায় নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করলে।
১. পাতা ঝরানোর পর পাটগাছের গোড়ার দিকের প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার তিন থেকে চার দিন পানির নিচে ডুবিয়ে রেখে তার পর জাগ দিতে হয়। এতে গোড়ার অংশ অনেক নরম হয় এবং ছাল ছাড়ানোর সময় গোড়ার আঁশ সহজেই আলাদা হয়।
২. পাটগাছের গোড়ার ৪৫ সেন্টিমিটার একটি কাঠের হাতুড়ির সাহায্যে হালকা করে থেঁতলে নিয়ে আঁটিগুলো পানিতে ডুবিয়ে দিতে হয়। তবে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হয়, দু’টি পদ্ধতি কখনোই একসাথে ব্যবহার করা যায় না। যেকোনো একটি পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। পানিতে জাগ তৈরির সময় প্রথম সারিতে লম্বালম্বিভাবে আঁটিগুলো পাশাপাশি রাখার পর দ্বিতীয় সারিতে আঁটিগুলো আড়াআড়িভাবে রাখতে হয়। তৃতীয় সারিতে আবার প্রথম সারির মতো লম্বালম্বিভাবে রাখতে হয়। ওপর-নিচে তিন থেকে চারটির বেশি সারি করা ঠিক নয়। এভাবে জাগ তৈরি করলে জাগের মধ্যে সহজেই পানি এবং পাট পচনকারী ব্যাকটেরিয়া জীবাণু প্রবেশ ও চলাচল করতে পারে। এতে পাটপচন সহজ হয়। 
বদ্ধ জলাশয়ে পাট পচানোর ব্যবস্খা করলে প্রতি ১০০ আঁটির জন্য এক কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে পাট পচন দ্রুত হয়। এতে পাটের আঁশের রঙ ও মান ভালো হয়। ইউরিয়া সার কোনো একটি পাত্রে গুলে নিয়ে পচনপানিতে মিশিয়ে বা সরাসরি জাগের ওপরও ছিটিয়ে দেয়া যেতে পারে। চাড়িতে বা পলিথিন ট্যাংকে পাট পচানোর সময় প্রতি ১০০ মণ বা তিন হাজার ৭৩২ কেজি কাঁচা পাটের ছালের জন্য ০.৫ কেজি ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হয়। 
পাট বেশি পচলে আঁশ বেশ নরম হয়ে যায়, আবার কম পচলে আঁশ গায়ে ছাল লেগে থাকে। তাই এমন সময়ে পাটের পচনপ্রক্রিয়া থামানোর প্রয়োজন হয়, যখন আঁশগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে না, কিন্তু শক্ত থাকে। জাগ দেয়ার ৮ থেকে ১০ দিন পর থেকেই হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। দুই থেকে তিনটি পচা পাটগাছ জাগ বা ছালের মোড়া থেকে বের করে ধুয়ে আঁশ পরীক্ষা করে পচনের শেষ সময় ঠিক করা যায় বা বের করা যায়। পচা পাটের মধ্যাংশ থেকে দুই থেকে তিন সেন্টিমিটার পরিমাণ ছাল কেটে ছোট একটি স্বচ্ছ শিশির ভেতরে পরিষ্কার পানি দিয়ে ঝাঁকিয়ে যদি দেখা যায়, আঁশগুলো বেশ খানিকটা আলাদা হয়ে গেছে তখন বুঝতে হয় পচনপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। একটা কথা মনে রাখা খুব প্রয়োজন, বেশি পচনের চেয়ে একটু কম পচনই ভালো। সঠিক সময়ে আঁশ ছাড়ালে কাটিংসের পরিমাণ কম হয়। আঁশ ছাড়ানোর সময় গোড়ার পচা ছাল হাত দিয়ে টেনে ফেলে দিলেও কাটিংসের পরিমাণ কমানো যায়। উন্নত মানের আঁশ পেতে হলে অবশ্যই প্রচলিত পদ্ধতিতে জলাশয়ে গাছসহ জাগ না দিয়ে রিবন রেটিংয়ের মাধ্যমে ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে জাগ দিয়ে আঁশ সংগ্রহ করতে হয়।


ব্যাঙের চাষ

ব্যাঙের চাষ
সুবিধা: 
 » ব্যাঙ চাষে ঝুকি কম, লাভ বেশী
» বিদেশের বাজারে প্রচুর চাহিদা
» ব্যবসায় প্রতিযোগীতা কম
» স্বল্প পুঁজি, স্বল্প জায়গা, অধিক আয়
স্থান নির্বাচন:
হাজা-মজা পুকুর, ডোবা অথবা জলা জমি হলেই চলবে, যেখানে গরমের সময় অন্তত এক ফুট পানি রাখা যাবে। এক থেকে দেড় বিঘা জমি হলেই চলবে। তবে বাহিরের বন্যার জলের প্রকোপ থেকে চাষ এলাকা বাঁচিয়ে রাখতে হবে, যাতে ব্যাঙাচি বেরিয়ে না পড়ে।
পুকুর তৈরি:
আদর্শ খামারের জন্যে দেড়বিঘায় দুটো পুকুর এবং একটা ছোট ডোবা রাখতে হবে। পুকুরের গভীরতা ৩-০ ফুটের বেশী প্রয়োজন নেই। পুকুর দুটো ও ডোবার চারদিকে শুরু করে বাঁশের বেড়া অথবা লোহার নেট অথবা নাইলনের শক্ত জাল একগজ উচু করে ও আধাহাত মাটিতে পুঁতে আটকিয়ে দিতে হবে। মাটিতে পুঁতে দেয়ার আগে আলকাতরা মাখিয়ে দিলে ভালো হয়।
পরিবেশ সৃষ্টি:
পুকুরের চার পাড়েই ছায়া দরকার। কারন ব্যাঙ সব সময় জালে থাকেনা। বিশ্রামের জন্যে ডাঙ্গায় উঠে এসে ঝোপ-ঝাড়ের ছায়াতে বিশ্রাম করে। একারনে জংলা গাছ লাগানো বিশেষ প্রয়োজন। এ জন্যে অনেকে রেডী গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন। কারন রেডী গাছে ছায়া হওয়ার পাশাপাশি পোকামাকড় বেশী আসার প্রবনতা থাকায় ব্যাঙের খাদ্যের যোগান হবে।
সতর্কতা: 
 » কোন প্রকারেই সাপ ঢুকতে দেয়া যাবে না। সাপ ব্যাঙের প্রধান শত্রু। উপর থেকে চিল বাজপাখী যাতে ব্যাঙ ধরে নিতে অথবা উপদ্রব করতে না পারে।
» পুকুর পাড়ে বা নিকটে খুব বড় গাছ না থাকাই ভালো।
» সাবান পানি, নর্দমার নোংরা পানি ও বিষাক্ত পানি কোন মতেই পুকুরে ঢুকতে দেয়া যাবে না।
চাষ পদ্ধতি:
ব্যাঙ: শুধুমাত্র সবুজ কোলা ব্যাঙ বা সোনা ব্যাঙ চাষের জন্য উপযোগী। বর্ষা শুরু পূর্বেই ১০০টি স্ত্রী ব্যাঙ ও ৫০ টি পুরুষ ব্যাঙ দুটো পুকুরের ঘেরের ভিতর ছাড়তে হবে। এ সংখ্যা বেশীও হতে পারে। তবে স্ত্রী ব্যাঙের চেয়ে পুরুষ ব্যাঙ প্রায় অর্ধেক রাখতে হবে।
খাবার প্রদান:
» ব্যাঙ সাধারনত জীবিত বস্তু খেয়ে থাকে। পোকা-মাকড়, সাপের বাচ্চা, আলগী, কেচোঁ, সাপের ডিম খেয়ে থাকে। কৃত্রিম খাবার হিসাবে ফিশ মিল, চাউলের কুড়াঁ, টিউবিফকস, ময়দা, খৈল ইত্যাদি খেয়ে থাকে। ব্যাঙাচি অবস্থায় এরা উদ্ভিদ জাতীয় খাবার খেতে বেশী পছন্দ করে। ব্যাঙাচিকে ময়দা গুলে ছোট ছোট করে দিলেই খাবে।
» এছাড়া পুকুরে ডিমওয়ালা কিছু চিংড়ি ও কাকঁড়া ছেড়ে দিতে হবে। এদের ডিম এবং বাচ্চা ব্যাঙের খাদ্য হিসাবে পাওয়া যাবে, সাথে সাথে কিছু মাছ ও কাকঁড়াও উৎপন্ন হবে পুকুর থেকে।
» পুকুর গুলোর উপর পানিতে একহাত উপরে ১২ হাত দুরে দুরে একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব অথবা কেরোসিনের হারিকেন জ্বালিয়ে রাখলে পোকা-মাকড় আকৃষ্ট হয়ে ছুটে আসবে।
» টিউবিফকস বা সরু সুতোরমত ফুল কেচোঁর চাষ করা যেতে পারে। এজন্যে পুকুর থেকে কিছুটা দুরে ত্রিশ চল্লিশ হাত লম্বা এবং দু’হাত চওড়া আর তিন হাত গভীর করে একটি নর্দমা কেটে পচাঁ পুকুর বা নর্দমার গাঢ় মাটি তুলে এনে রাখলে এবং সবসময় পানি দিয়ে স্যাতঁ-স্যাতেঁ করে রাখলে এমনিতেই ফুলকেচোঁ জন্ম নিবে। মাঝে মাঝে কিছু ময়লা এবং যাবতীয় পচাঁ জিনিস নর্দমায় দিয়ে পানি ঢেলে দিলেই চলবে। এ নর্দমার কেচোঁ ব্যাঙকে খেতে দেয়া যাবে, আকোরিয়ামের দোকানদারদের কাছে এ ধরনের কেচোঁ কিনতে পাওয়া যায়।
প্রজনন: 
 বর্ষার সাথে সাথে গর্জন, বৃষ্টিপাত ও ২৭-৩০ সে: তাপমাত্রা পেলে স্ত্রী ব্যাঙকে পুরুষ ব্যাঙ আকড়িয়ে ধরে ২-৩ ঘন্টা পানিতে ভাসতে থাকে। এরপর স্ত্রী ব্যাঙ ডিম ছাড়ে এবং পুরুষ ব্যাঙ শুক্রানু ছাড়ে। ডিমগুলো ফিতারমত পানিতে ভাসতে থাকে। ২৪ ঘন্টা পর ডিম থেকে ফুটে ব্যাঙাচি বের হবে। প্রায় ৩৫-৪০ দিনের ভেতর ব্যাঙাচি পুনাঙ্গ ব্যাঙে রুপান্তরিত হয়। একটি স্ত্রী ব্যাঙ প্রাকৃতিক অবস্থায় একসাথে ৩-১০ হাজার এবং খামারে চাষাধীন স্ত্রী ব্যাঙ ১-২ হাজার ডিম দিয়ে থাকে।
পুরুষ ব্যাঙ আলাদা রাখা:
» প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ব্যাঙের সংগ পেতে পুরুষ ব্যাঙের মধ্যে ভীষন মারামারি হয় তাই প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী ব্যাঙের তুলনায় অর্ধেক পুরুষ ব্যাঙ রাখাই ভাল।
» স্ত্রী ব্যাঙের প্রজননে ব্যাঘাত হয় পুরুষ ব্যাঙের প্রতিযোগীতার জন্য এবং একইসাথে পুরুষ ব্যাঙ মারাত্নকভাবে আহত হতে পারে।
বড় ব্যাঙ আলাদা করা:
স্ত্রী এবং পুরুষ দৈহিক মিলনের সময় দেয়া ডিম ও শুক্রানু ছেড়ে দেয়া ছাড়া আর কোন দায়িত্ব পালন করেনা। কিন্তু পরবর্তীতে এরাই ডিম ও ব্যাঙাচি ভক্ষন করে থাকে। এই ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ডিম ছাড়া হয়ে গেল সবগুলো ব্যাঙকে আলাদা কে নেয়া উচিত।
কেমন করে আলাদা করবেন:
নিকটে অবস্থিত ডোবায় স্ত্রী ও পুরুষ ব্যাঙ আলাদা ভাবে রাখতে হবে এবং ৪০-৪২ দিন পর পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে।
পুরুষ ও স্ত্রী ব্যাঙ কি করে চিনবেন:
পুরুষ ব্যাঙ চেরার উপায়:
» নীচের চোয়ালের দুধারে দুটি কাল বর্ণের স্বর থলি আছে।
» নীচের চোয়ালের সামনে দু’হাতের মাঝখানের জায়গা হলুদ রংয়ের থাকে।
» গায়ের পর্দা সাধারনভাবে ছোট হয় এবং আঙ্গুল মোটা হয়।
» গায়ের কব্জী বেশ মোটা হয়।
» প্রজনন ঋতুতে উজ্জল বর্ণ ধারন করে।
» সামনের পায়ের পেছন দিকে চাপ দিলে মুখ থেকে শব্দ করতে থাকে।
» আকারে বড় ও ওজন বেশী হয়।
স্ত্রী ব্যাঙ চেনার উপায়:
» স্বর থলি নেই।
» সব ঋতুতেই চোয়ালের সামনে দু’হাতের মাঝখানের জায়গার রং হালকা ধুসর থাকে।
» গায়ের পর্দা বড় দেখায় এবং আঙ্গুল সরু হয়।
» পায়ের কব্জী বেশ সরু হয়।
» প্রজনন ঋতুতে পেট ফুলে থাকে।
» সামনের পায়ের পেছন দিকে চাপ দিলে কোনরকম শব্দ করতে পারে না বরং পেট ফুলে উঠে এবং কিছু ক্ষেত্রে মলমুত্র ত্যাগ করে।
» আকারে ছোট ও ওজন কম হয়।
বাজারজাত করণ:
ব্যাঙ নয় মাস থেকে ১২ মাসের মধ্যেই বিক্রয় যোগ্য হয়। কিছু ব্যাঙ তুলে বিক্রি করার পর বাকী ব্যাঙ তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠবে। দু’বছর পার হয়ে গেলে সব ব্যাঙ ধরে বিক্রি করে দিতে হবে। কারন এ অবস্থায় ব্যাঙগুলো তিন বছরের বেশী বাচঁবেনা এবং তখন মাংস শক্ত হয়ে যাবে। এতে লোকসান হওয়ার ভয় থাকে।
ব্যাঙের খাওয়ার উপযোগী অংশ:
মানুষের খাবার উপযোগী শুধু ব্যাঙের দু’টো পা। অন্য অংশ মাছ ও পোল্ট্রি খাবার হিসাবে ব্যবহার হতে পারে। মাগুর, পাংগাস, চিতল ও আইড় মাছের উৎকৃষ্ট খাবার। এ ছাড়া ব্যাঙের মাথায় আবস্থিত ‘পিটুইটারী গ্রন্থি’ মাছের প্রজনন কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।


শামুক চাষ

শামুক চাষ
শিক্ষিত যুবকরা মাছ চাষে জড়িত হলে শুধু যে বেকার সমস্যার সমাধান হয় তা-ই নয়, চাষাবাদ পদ্ধতিরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। তেমনই এক পরিবর্তনের সূচনা করেছেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার সত্রাশিয়া এলাকার আবু রেজা মাহবুবুল হক শাহীন (৫০)। মাছ চাষে তিনি শুরু করেছেন শামুকের ব্যবহার। নিজ খামারেই তিনি শামুক থেকে মাছের খাদ্য তৈরি করছেন। এতে তাঁর বাজারজাত মৎস্য খাদ্য ব্যবহারের পরিমাণ কমেছে। ফলে মাছ চাষের ব্যয়ও কমে এসেছে। এ ছাড়া শামুকের তৈরি খাবার খাওয়ানোয় মাছের স্বাদও ভালো বলে মাহবুবুল হক জানান। কোনো কোনো মাছ চাষি মাহবুবুল হকের কাছে জানার পর নিজেদের খামারেও এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা মাছ চাষে শামুকের ব্যাপক ব্যবহারকে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বলে মন্তব্য করেছেন। এ ছাড়া মাছ চাষে শামুকের তৈরি খাবার ব্যবহার বাড়লে দেশে 'মিট অ্যান্ড বোন'-এর আমদানি অনেকাংশে কমে যাবে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
কাকতলীয় ঘটনার মধ্য দিয়েই যেমন বড় বড় ঘটনা বা কাহিনীর সূত্রপাত, ময়মনসিংহের মাহবুবুল হক শাহীনের ক্ষেত্রেও অনেকটা তেমনি। মাহবুবুল হক শাহীনের মাছ চাষি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। তিনি ১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স করেন। ১৯৯১-এর দিকে ফ্রান্সে চলে যান। কিন্তু ২০০৫-এ আবার দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে নিজ এলাকা মুক্তাগাছায় চাচা এম এ সোবহানের মাছের খামারে যুক্ত হন। শুরু করেন শিং, মাগুর, কৈ, পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া মাছের চাষ। শিক্ষিত যুবক হলেও একজন পরিশ্রমী মানুষ হিসেবে দিনভর কাদা-পানিতে মাখামাখি করে সাফল্যস্বরূপ প্রথম বছরই মাছ চাষে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ লাভ করেন। 
মাছ চাষের সময়ই মাহবুবুল হক শাহীন খেয়াল করেন, একটি পুকুরের পাঙ্গাশ মাছ বেশ পুষ্ট হয়েছে। কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি মাছের পেটে পেলেন শামুক। এ ঘটনাটি মাহবুবুল হক শাহীনকে নতুন করে ভাবায়। তিনি খালবিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট একটি পুকুরে চাষ শুরু করেন। যোগাযোগ করেন মৎস্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। শামুক চাষে তিনি সফল হন। এরপর সফল হন শামুক থেকে মাছের খাদ্য তৈরিতেও। মাহবুবুল হক শাহীন বলেন, তাঁর খামারে মাছের খাবারের প্রায় ৪০ ভাগ এখন তিনি শামুক থেকে তৈরি করছেন। গত বছর তিনি শামুক থেকে খাদ্য তৈরি করেছিলেন চার টন। এবার তাঁর লক্ষ্যমাত্রা আট টন। মাহবুবুল হক শাহীন বলেন, তাঁর নিজের পুকুরের শামুক থেকে যে খাবার তৈরি হয়, এটি তাঁর নিজের খামারেই প্রয়োজন পড়ে। তবে তিনি প্রান্তিক অনেক মাছ চাষিকে এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করে যাচ্ছেন। নিবেদিতপ্রাণ মাছ চাষি মাহবুবুল হক শাহীন দিন-রাত মাছ চাষ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তিনি তাঁর নিজের মেধা আর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে মাছ চাষে বিভিন্ন ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করছেন। 
তিনি বলেন, একজন মাছ চাষি তাঁর ক্ষুদ্র প্রযুক্তির ব্যবহার করে শামুক থেকে মাছের অন্যতম উপকরণ প্রোটিন উৎপাদন করতে পারে। মাছ চাষির উৎপাদিত প্রোটিনে কোনো রাসায়নিক প্রভাব থাকার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, আমাদের দেশে মাছ চাষে প্রোটিনের উৎস হিসেবে যে শুঁটকি ব্যবহার করা হয়, তা সংরক্ষণের জন্য প্রচুর পরিমাণে নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মানব শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবে শামুকে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে না। তাঁর ভাষায়, 'সুস্বাস্থ্যের জন্য' শামুক চাষে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
তিনি বলেন, কুড়া, খৈল, শামুকের গুঁড়ো, ভিটামিন, লবণ শ্রমিক ও মেশিন চার্জ মিলিয়ে শামুক দিয়ে তৈরি এক কেজি মাছের খাবারের মূল্য সাড়ে ১১ টাকার মতো। অথচ বাজারে মাছের খাবারের মূল্য প্রতি কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা। শামুক চাষ সম্পর্কে মাহবুবুল হক শাহীন বলেন, ৪০-৪৫ দিনে ১২০ শতাংশ পুকুর থেকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় দুই হাজার কেজি শামুক আহরণ সম্ভব। প্রতি কেজি শামুকের গড় উৎপাদন ব্যয় হয় মাত্র পাঁচ টাকা মতো।
মাহবুবুল হক শাহীন বলেন, বাংলাদেশে ছোট দেশীয় শামুক চাষ সম্প্রসারণ ও সঠিক বাজারজাতকরণের মধ্য দিয়ে মাছ সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এতে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত মিট অ্যান্ড বোনের ওপর চাপ কমবে। বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। তিনি এ বিষয়টি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
মৎস্য বিজ্ঞানী বললেন
মাহবুবুল হক শাহীনের শামুক চাষ এবং এর থেকে মাছের খাবার তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুল হক রিপন। তিনি বলেন, পুকুরে শামুক চাষ এবং তা থেকে খাবার তৈরি করে মাহবুবুল হক শাহীন সাফল্য পেয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন শামুক থেকে খাদ্য তৈরি করলে মাছের খাবার বাবদ ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। তিনি বলেন, যদি মাছ চাষে ব্যাপকভাবে শামুকের তৈরি খাবার ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিদেশ থেকে মাছের খাদ্য 'মিট অ্যান্ড বোন' আমদানি অনেকাংশে কমে যাবে। এতে দেশের লাভ, চাষির লাভ। ড. মাহফুজুল হক রিপন বলেন, তাঁর ধারণা, শামুক থেকে উৎপাদিত খাদ্য মাছ বেশি খায়। কারণ এ খাবার অনেকটাই প্রাকৃতিক। এতে মাছ তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধিও পায় বেশি। এ ছাড়া শামুকের তৈরি খাবার খাওয়া মাছ স্বাদেও অনেকটা ভালো হয় বলে তিনি জানান। ড. মাহফুজুল হক রিপন আরো বলেন, দেশে চাষি পর্যায়ে শামুক চাষ কতটুকু সম্ভব, এর সমস্যা এবং সম্ভাবনাগুলো কী কী-সেটি বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই একটি পুকুরে শামুক চাষ করে গবেষণা করছেন। এ বছরের শেষ দিকে এ গবেষণার ফলাফল পাওয়া যাবে।
চাষ কৌশল
১২০ শতাংশের পুকুরে প্রতি শতাংশ হিসেবে এক কেজি গোবর, এক কেজি খৈল ও ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া পানিতে ভালোভাবে মেশাতে হবে। এ মিশ্রণ সমান চার ভাগে ভাগ করে তিন দিন অন্তর পানিতে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুরের পানির রং যখন গাঢ় সবুজ হবে, তখন বুঝতে হবে পুকুরটি শামুক চাষের উপযোগী হয়েছে। এরপর খালবিল বা পুকুর থেকে শামুক সংগ্রহ করে প্রতি শতাংশ হিসেবে ২৫০ গ্রাম শামুক পুকুরের চারদিকে ছিটিয়ে দিতে হবে। পরবর্তী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে শামুক ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করবে। এরপর ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শামুক পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ১২০ শতাংশ পুকুর থেকে ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে প্রায় দুই হাজার কেজি ছোট শামুক উৎপাদন সম্ভব। শামুকের খাবার হিসেবে প্রতি শতাংশ হিসেবে ২৫০ গ্রাম গোবর, ২৫০ গ্রাম খৈল এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া মেশানো কম্পোস্ট তিন দিন পরপর পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে। পুকুর থেকে শামুক তুলে চালের কুড়ার সঙ্গে মিশিয়ে তাজা শামুককে প্রথমে খাদ্য ভাঙানোর পিলেট মেশিনের মাধ্যমে গুঁড়ো করা হয়। এগুলো পরে রোদে শুকানোর পর খৈল ভাঙানোর মেশিনের মাধ্যমে আবার সূক্ষ্মভাবে চূর্ণ করে সরাসরি মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়।


মাছের রোগব্যাধি, প্রতিকার ও করণীয়


মাছের নানা রোগব্যাধি, প্রতিকার প্রতিরোধে করণীয়
জীবিত প্রাণিমাত্রই কোনো এক সময় রোগাক্রান্ত হবে, এটাই স্বাভাবিক। মাছের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় না। তবে নানা কারণে উন্মুক্ত জলাশয়ের চেয়ে বদ্ধ জলাশয়ে চাষ করা মাছে রোগাক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। তাই পুকুর-দীঘির মাছকে প্রায়ই নানান রোগের কবলে পড়তে দেখা যায়। পুকুর-দীঘিতে সচরাচর যেসব রোগে মাছ আক্রান্ত হতে পারে, এ ধরনের কয়েকটি সম্ভাব্য রোগ ও তার প্রতিকার সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হলো। 
মাছের ক্ষত রোগ:
এ রোগে সাধারণত শোল, গজার, টাকি, পুঁটি, বাইন, কৈ, মেনি, ম্রিগেল, কার্পিও এবং পুকুরতলায় বসবাসকারী অন্যান্য প্রজাতির মাছ আক্রান্ত হয়ে থাকে। 
মাছের ক্ষত রোগ চেনার উপায়:
আক্রান্ত মাছের গায়ে ক্ষত বা ঘাজনিত লাল দাগ দেখা যায়। এই দাগের আকৃতি ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ঘায়ের স্খানে চাপ দিলে কখনো কখনো পুঁজও বের হতে পারে। ঘা মাছের লেজের গোড়া, পিঠ ও মুখের দিকেই বেশি হয়ে থাকে। 
ক্ষত রোগ হলে করণীয়:
রোগাক্রান্ত মাছ পুকুর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ফেলতে হবে। ১০ লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম লবণ গুলে লবণমিশ্রিত পানিতে রোগাক্রান্ত মাছ পাঁচ থেকে দশ মিনিট ডুবিয়ে রেখে অত:পর পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে।
ক্ষত রোগে আক্রমণের আগেই প্রতি বছর আশ্বিন মাসের শেষে কিংবা কার্তিক মাসের প্রথম দিকে পুকুরে শতাংশ প্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ও ১ কেজি হারে লবণ প্রয়োগ করা হলে সাধারণত আসন্ন শীত মৌসুমে ক্ষত রোগের কবল থেকে মাছ মুক্ত থাকে।
বিশেষজ্ঞ সূত্র থেকে জানা যায়, এ রোগ নিরাময়ের জন্য ০.০১ পিপিএম চুন ও ০.০১ পিপিএম লবণ অথবা ৭-৮ ফুট গভীরতায় প্রতি শতাংশ জলাশয়ে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ও ১ কেজি হারে লবণ প্রয়োগ করা হলে আক্রান্ত মাছ দুই সপ্তাহের মধ্যেই আরোগ্য লাভ করে। 
মাছের পেট ফোলা রোগ:
এ রোগে সাধারণত রুইজাতীয় মাছ, শিং-মাগুর ও পাঙ্গাশ মাছ আক্রান্ত হয়ে থাকে। 
মাছের ঘা রোগ চেনার উপায়:
এ রোগে মাছের দেহের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়। পেটে পানি জমার কারণে পেট ফুলে যায়। মাছ ভারসাম্যহীনভাবে চলাফেরা করে। বেশিরভাগ সময়ই পানির ওপর ভেসে ওঠে এবং খাবি খায়। আক্রান্ত মাছ অতি দ্রুত মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে থাকে।
মৎস্যবিজ্ঞানীদের মতে অ্যারোমোনাডস জাতীয় ব্যাকটেরিয়া এ রোগের কারণ। 
পেট ফোলা রোগে করণীয়:
প্রথমত খালি সিরিঞ্জ দিয়ে মাছের পেটের পানি বের করে নিতে হবে। অত:পর প্রতি কেজি মাছের জন্য ২৫ মিলিগ্রাম হারে ক্লোরেম ফেনিকল ইনজেকশন দিতে হবে অথবা প্রতি কেজি সম্পূরক খাবারের সাথে ২০০ মিলিগ্রাম ক্লোরেম ফেনিকল পাউডার মিশিয়ে মাছকে খাওয়াতে হবে।
প্রতিকার হিসেবে প্রতি শতাংশ জলাশয়ে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মাছের খাদ্যের সাথে ফিসমিল ব্যবহার করা একান্তই অপরিহার্য।
এ ছাড়া পুকুরে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদনসহ মাছকে নিয়মিত সুষম খাদ্য প্রদানের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। 
পাখনা অথবা লেজপচা রোগ:
এ রোগে সাধারণত রুইজাতীয় মাছ, শিং-মাগুর ও পাঙ্গাশ মাছ আক্রান্ত হয়ে থাকে। 
পাখনা বা লেজপচা রোগ চেনার উপায়:
এ রোগে আক্রান্ত হলে প্রাথমিকভাবে পিঠের পাখনা এবং ক্রমান্বয়ে অন্যান্য পাখনাও আক্রান্ত হয়। কোনো কোনো মৎস্যবিজ্ঞানীর অভিমত, অ্যারোমোনাডস ও মিক্সোব্যাকটার গ্রুপের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগের সংক্রমণ ঘটে। পানির ক্ষার স্বল্পতা ও পি-এইচ ঘাটতি দেখা দিলেও এ রোগের উৎপত্তি হতে পারে। 
পাখনা বা লেজপচা রোগে করণীয়:
০.৫ পিপিএম পটাশযুক্ত পানিতে আক্রান্ত মাছকে ৩ থেকে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। পুকুরে সাময়িকভাবে সার প্রয়োগ বìধ রাখতে হবে।
এ ছাড়া রোগ-জীবাণু ধ্বংসের পর মজুদকৃত মাছের সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে হবে। এ অবস্খায় প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে পাথুরে চুন প্রয়োগ করা অতি জরুরি। 
মাছের উকুন রোগ:
এ রোগে সাধারণত রুই মাছ, কখনো কখনো কাতল মাছও আক্রান্ত হতে পারে। গ্রীষ্মকালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ রোগে মাছের সারা দেহে উকুন ছড়িয়ে দেহের রস শোষণ করে মাছকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। এতে মাছ ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে মারা যায়। 
উকুন রোগে করণীয়:
শতকরা আড়াই ভাগ লবণ দ্রবণে কিছু সময় আক্রান্ত মাছ ডুবিয়ে রাখলে উকুনগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়বে। এমতাবস্খায় হাত কিংবা চিমটা দিয়ে উকুনগুলো মাছের শরীর থেকে তুলে ফেলতে হবে। 
পুষ্টির অভাবজনিত রোগ:
এ রোগে পুকুরে চাষযোগ্য যেকোনো মাছই আক্রান্ত হতে পারে। ভিটামিন এ.ডি এবং কে-এর অভাবে মাছ অìধত্ব এবং হাড় বাঁকা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। মাছের খাবারে আমিষের ঘাটতি দেখা দিলেও মাছের স্বাভাবিক বর্ধনপ্রক্রিয়া বিঘিíত হয়। অচিরেই মাছ নানা রোগের কবলে পড়ে।
এসব রোগে আক্রান্ত মাছকে খাবারের সাথে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সুনির্দিষ্ট ভিটামিন ও খনিজ লবণ মিশিয়ে খাওয়ানো হলে যথাশিগগিরই মাছের শারীরিক সুস্খতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়। 
তাই, সুস্খ সবল মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি মাছকে সম্পূরক খাদ্য প্রদান অত্যাবশ্যক। মাছের রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার পরিবর্তে মাছের রোগ যাতে না হয়, সে ব্যবস্খা গ্রহণ করাই উত্তম। কেননা, মাছ চাষের ক্ষেত্রে মাছের রোগ একটি বড় সমস্যা।
সর্বোপরি সঠিক ব্যবস্খাপনা, যথাযথ নিয়মপদ্ধতি তথা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মাছ চাষ করা হলে চাষকৃত পুকুরে মাছের রোগ প্রতিরোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব।


নদীর উপর ভাসমান খাচায় মৎস্য চাষ

নদীর উপর ভাসমান খাচায় মৎস্য চাষ
জালের খাঁচায় মাছের চাষ খাঁচায় মুরগী পালন বিষয়টির সাথে ইতোমধ্যে আমরা বেশ পরিচিত হয়েছি এবং এই পালন ব্যবস্থাটির প্রসারও ঘটেছে। ছিক এ মুহূর্তে যদি আপনাকে বলা হয় 'জালের খাঁচায় মাছের চাষ' করবেন ? হবে হঠাৎ করে আপনিও সেই সময়কার মতো একটু অবাক হবেন, যেমন খাঁচার মুরগী পালনের জন্য ব্যবস্থাটি কী ত্বরিৎ গতিতে প্রসারিত হয়েছে কত মানুষ আজ এ পেশায় কর্মের সংস্থান করে নিয়েছেন। জালের খাঁচায় মাছের চাষ ব্যবস্থাটিও একদিন এমনি জনপ্রিয় হবে, হাজারও মানুষের কর্মের সংস্থান হবে এ খাতে, আমিষের উৎপাদন বাড়বে, শক্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি।
যাদের পুকুর নেই মাছ চাষ আজ আর তাদের জন্য সমস্যাই নয়। জালের খাঁচায় মাছ চাষের আদর্শ ক্ষেত্রই হচ্ছে নদী-নালা, খাল-বিলসহ উন্মুক্ত জলাশয়। যেখানে প্রবল স্রোত নেই অথচ আছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। মাছ চাষের জন্য উত্তম জায়গা হচ্ছে এমন উৎসগুলো। মশারির মোত বিশাল আকারের জাল প্রবহমান পানিতে ডুবিয়ে চারকোণা বেধেঁ তাতে ২"- ৩" সাইজের পোনা ছেড়ে মাস চারেক লালন-পালন কলে পুকুরে যে উৎপাদন পাবেন তার অন্তত কৃড়িগুণ বেশি পাবেন এখানে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসতে পারে, বেশি উৎপাদনের কারণ কি? উত্তর হচ্ছে: পুকুরের পানি বদ্ধ আর এখানকার পানিতে সব সময়ই স্বাভাবিক প্রবাহ আছে। তাই এখানকার পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ পুকুরের চাইতে অনেক বেশি যা মাছের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। পুকুরে মাছকে সরবরাহকৃত খাবারের উচিছষ্ট এবং মাছের মল জমে পানি কিছুটা হলেও দূষিত করে, এখানে সে সুযোগ নেই। সরবরাহকৃত খাবারের উচ্ছিষ্ট এবং মাছের আবর্জনা জালের সরু ফাঁক দিয়ে প্রবাহিত পানিতে চুয়ে যায় যার ফলে পানি সব সময়ই বিশুদ্ধ থাকছে। পুকুর বদ্ধ হওয়ার জৈব খাবারের পরিমাণ কম। এখানে জৈব খাবার উৎপাদনের সুযোগ অনেক বেশি যা মাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। এরকম অনেক উদাহরণ দাঁড়করানো যাবে জালের খাঁচায় মাছের চাষকে জনপ্রিয় করার জন।
আমাদের জানা মতে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মাছ চাষের নতুন এই ব্যবস্থাটির প্রবর্তন করেন গাজীপুর জেলার কালিগঞ্জ থানার উলুখেলিক গ্রামের হাবিবুর রহমান। তিনি স্থানীয় বালু নদীতে বহুদিন বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে সফল হয়েছেন এবং এখন তিনি বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতিতে মাছের চাষ করছেন। জালের খাঁচায় মাছের চাষে হাবিবুর রহমান সাহেবের প্রাপ্ত ফল থেকেই কারিগরী এই তথ্যগুলো উপস্থাপিত হল: বাংলাদেশে প্রকৃতিগত কারণেই আমার বিশ্বাস, জালের খাঁচায় মাছের চাষ ব্যবস্থাটি জনপ্রিয় হবে। কারণ বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের অর্ধেক পানির নিচে থাকে। এই ৪/৫ মাস সময়ে নদী-নালা, খাল-বিলই হওয়া উচিত মাছ চাষের মোক্ষম স্থান। 
খাঁচায় মাছ চাষের সুবিধা দেশের ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, হালদা, সুরমাসহ অধিকাংশ নদ-নদীর বাঁকে এ ধরনের মৎস্য চাষ সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে পানি দূষণমুক্ত, খরস্রোতমুক্ত এবং শত্রুমুক্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, নদীতে খাঁচায় মাছ চাষ করলে সহজেই প্রবহমান নদীর পানি পাওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক উৎস্য থেকেও অনেকটা খাবার পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে পুকুর খনন ও তৈরির অতিরিক্ত খরচ কমে যায়। যেকোনো সময়ই খাঁচার সংখ্যা বৃদ্ধি করে খামার সম্প্রসারণ সম্ভব। নদীর প্রবহমান পানিতে প্রচুর অক্সিজেন থাকায় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া খাঁচার মাছের বর্জ্য পানির স্রোতে অন্যত্র চলে যায়, ফলে পানি দূষিত হয় না। যদিও খাঁচা তৈরিতে কিছু খরচ হয়, তথাপি ভূমির মালিকানা সমস্যা, ভূমি ক্রয় এবং ভূমির ব্যবহার থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ফলে ওই জমি কৃষিকাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

খাঁচা কোথায় বসাতে হবে খাঁচা যে কোনো মাপের হতে পারে। ১ বর্গ মি. (২ হাত- ২হাত প্রায়) বা ৫ বর্গ মি. ১০,৫০ বা ১০০.৫০ বর্গ মি. মাপের। এই খাঁচা বড় পুকুরেও বসাতে পারেন। তবে সেখানে সমস্ত পুকুরের আয়তনের মাত্র ৫ ভাগ অথবা ১০ ভাগ ব্যবহারকরতে পারবেন ভালো উৎপাদন যেমন প্রতি ঘনমিটারে (২ হাত- ২হাত - ২হাত প্রায়) ১০ কেজি থেকে ১৫ কেজি। আপনি পেতে পারেন ৪/৫ মাসে । সেখানে খাঁচা বসাতে হবে চলমান খোরা পানিতে। যেমন বর্ষা মৌসুমে যে সমস্ত এলাকা ডুবে যায়, সেখানে অথবা নদীর বাঁকে যেখানে স্রোত থাকে খুব কম। খাঁচা বসাতে পানির গভীরতা থাকতে হবে সর্বনিম্ন ১.২ মি. বা ৪৬ ইঞ্চি তবে সর্বস্ব পানির উচ্চতায় কোনো হিসাব নেই। পানি যতই বৃদ্ধি পাক খাঁচার কোনো অসুবিধা নেই। খাঁচা বসাতে খাঁচার মাপে উপরে একটা বাঁশের ফ্রেম তৈরি করতে হবে এবং চার কোণায় বাঁশ পুঁতে শক্ত করে বেঁধে দিতে হবে। পানি বাড়লে খাঁচা তুলে উপরে করে দেবেন, পানি কমলে খাঁচা নিচু করে দেবেন। খাঁচার ওপর খোলা এবং ৫ দিকে জাল এবং পানির উপরে ১ ফুট উঁচু রাখতে হবে।

এই খাঁচা কিসের তৈরিতিন বা চার ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি ফাঁস আকারের মূল পলিথিলিন জাল বা এইচডিপি জাল, খাদ্য আটকানোর বেড় তৈরির জন্য পলিয়েস্টার কাপড়, নাইলনের দড়ি, এক ইঞ্চি জিআই পাইপ, ভাসমান খাঁচার জন্য পিভিসি ব্যারেল বা ড্রাম, খাঁচা স্থির রাখার জন্য অ্যাঙ্কর ও বাঁশ। এই জালের খাঁচা এক বিশেষ ধরনের পলিথিন জাতীয় সুতা থেকে তৈরি। এই জাল সাধাণত গিরাবিহীন মেশিনে তৈরি করা হয়। আবার আপনি চাইলে গিড়া দিয়ে হাতেও তৈরি করে নিতে পারেন। বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা ঐ জাল বাজারেও পাওয়া যায়। এই পলিথিন সুতার জালের সুবিধা হল, এই জাল কাঁকরায় কাটতে পারে না, পানিতে পচে না। বছরে দুটি ফসল তোলা কোনো সমস্যা নয়। বর্ষা মৌসুমে বিলে আবার শীত মৌসুমে খালে। 
খাঁচা তৈরি প্রথমেই জিআই পাইপ দ্বারা সাধারণত (দৈর্ঘ্য ২০ ফুট × প্রস্থ ১০ ফুট × উচ্চতা ৬ ফুট) বা (দৈর্ঘ্য ১২ ফুট × প্রস্থ ১০ ফুট × উচ্চতা ৬ ফুট) সাইজের আয়তকারের ফ্রেম তৈরি করতে হবে। ওই ফ্রেমের প্রতিটি কোণে ১০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট একটি করে জিআই পাইপ ঝালাই করে বসিয়ে দিতে হবে। এরপর ফ্রেমের চারপাশে জাল বেঁধে দিতে হবে। প্রতি দুই ফ্রেমের মধ্যে তিনটি করে প্লাস্টিকের ড্রাম স্থাপন করে পানিতে সারিবদ্ধভাবে ফ্রেমগুলো স্থাপন করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক নোঙর দিয়ে খাঁচাটি পানির নির্দিষ্ট স্থানে বসাতে হবে। এ ক্ষেত্রে জিআই পাইপের স্থলে বাঁশও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে স্থায়িত্বকাল কম হয়।

খাঁচার কী কী মাছের চাষ করা যায়
খাঁচায় কিন্তু সব ধরনের মাছের চাষ করা যায় না বা ভালো উৎপাদন পাওয়া যায় না। হাবিব সাহেব ১৯৮৯ সালে প্রথম ১৮ প্রজাতির মাছ নিয়ে গবেষণা করেন এবং ভালো উৎপাদন হয়।
১. বিদেশী ঘাওর
২. নাইলোটিকা
৩. রাজপুঁটি
৪. কার্প প্রজাতি
৫. পাঙ্গাশ।
এই সমস্ত মাছের গড় উৎপাদন ৪/৫ মাসে প্রতি ঘনমিটার ৫/১৫ কেজি। 
কী মাপের পোনা ছাড়তে হবে পোনা সব সময়ই বড় সাইজের ছাড়া ভালো। এতে সুবিধা হল চাষকালীন সময় কম লাগবে, আবার মুতু্যর হারও কম হবে। পোনা যত বড় সাইজের পাওয়া যায় তত আপনার জন্য লাভজনক। তবে ২ থেকে ৩ ইঞ্চি এর কম হলে চলবে না। কারণ জালের ওপর নির্ভর করে পোনা ছাড়তে হবে। 
প্রতি ঘনমিটারে কত পোনা ছাড়বেন এর কোনো সুনিদির্ষ্ট নিয়ম নেই। আসল কথা হল আমি কী মাছ ছাড়ব, কত বড় করে কতদিনে বাজরে বিক্রি করব, যেমন ধরুন- নাইলোটিকা মাছের চাষ করব। বাজারে বিক্রিযোগ্য সাইজ ১০০ গ্রাম। আমি উৎপাদন করব প্রতি ঘনমিটারে ১০ কেজি। সেখানে পোনা ছাড়ব প্রতি ঘনমিটারে ১০০টা + ৫% mortality বা ধরে নিব মারা যাবে। তেমনিভাবে যদি আফ্রিকান মাগুর ছাড়তে চাই এবং লক্ষ্যমাত্রা প্রতি ঘন মি. ১৫ কেজি এবং প্রতিটা মাছের গড় ওজন ২৫০ গ্রাম। তবে সেখানে পোনাছাড়তে হবে। ৬০টা + ৫%। 
খাঁচায় মাছের কী কী খাদ্য দিতে হবে প্রাণী মাত্রই খাদ্য দরকার। খাদ্য ছাড়া কোনো প্রাণী বাঁচে না। খাঁচায় অধিক ঘনত্বে মাছ থাকে বিধায় তা প্রয়োজনের সবটুকু খাদ্য আপনাকে বাইরে থেকে দিতে হবে। যদিও চলমান বা খোলা পানিতে কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীকণা সব সময়ই আসে। তবে তা যথেষ্ট নয়। অনেক অনেক বিল বা খাল এলাকায় কোনো মৌসুমে প্রচুর উদ্ভিদ কণার জন্ম হয় যে অল্প ঘনত্বে মাছ ছেড়ে বিনা খাদ্যেই প্রতি ঘন মি. ৪/৫ মাসে ৫/৭ কেজি মাছ উৎপাদন করা যায়। তবে সুষম খাদ্য হিসাবে মাছকে দৈনিক ২/৩ বার খাবার দিতে হবে। এখানে থাকবে প্রাণিজ আমিষ, যেমন- শুটকি মাছ শামুকের মাংস অথবা গরু-ছাগলের রক্ত অথবা মাংসের ছাটি অথবা গরু-ছাগলের নাড়ি-ভুঁড়ি ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত খৈল। যে কোনো খৈল, সরিষা, তিল নারকেল বাদাম সয়াবিন, তিসি, তুলা ইত্যাদি। উচ্ছিষ্ট ভাত। এছাড়া প্রচুর ঘাস খায় নাইলোটিকা, গ্রাস কার্প ও রাজপুঁটি। বর্ষাকালে আমাদের দেশের নিম্ন বিলাঞ্চল ভারে থাকে নানা ধরনের ঘাস। এ সমস্ত ঘাসের মধ্যে নরম ঘাস, যেমন- রাইদা, ইছাদল, পোটকা প্রভৃতি। সুষম খাদ্য তৈরি করতে দিতে হবে শটকি অথবা যে কোনা প্রাণিজ আমিষ ১০-৩০%, খৈল ২০-৪০%, গমের ভুষি/মিহি কুঁড়া ২০-৫০% তার সাথে ৫% চিটাগুড় ও ৫-১০% সস্তা দামের আটা ও ০.৫% ভিটামিন। খাবার তৈরি করারসময় একটুকু পানি মিশাবেন যেন খাবারটা মাখতে মাখতে সাবানের মতো শক্ত বলে পরিণত হয়। মাছ সেই বল থেকে কামড় দিয়ে খাবার নেবে। যদি খাদ্য ও পানি ভালোভাবে মিশে শক্ত বলে পরিণত না হয় তবে খাদ্য পানিতে গুলে যাবে। মনে রাখতে হবে তৈরি বল ১৫-২০% মিটার পর্যন্ত পানিতে যেন না গলে। এভাবে খাদ্য তৈরি করে বাঁশের ঝুড়িতে করে খাঁচার মধ্যে পানির ১ হাত নিচে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। মাছ ৫-১০ মিনিটের মধ্যে সমস্ত খাদ্য শেষ করে ফেলবে। 
দৈনিক কী পরিমাণ খাদ্য দিতে হবে মাছ তার দৈহিক ওজনের গড়ে ৩-৫% খাদ্য খায়। তবে ১ গ্রাম থেকে ২০ গ্রাম পর্যন্ত পৌছতে ১০-২০% পর্যন্ত খাদ্য খায় এবং এই সময় তবে বাড়তিও বেশি হয়। গড়ে সুষম খাদ্য দিয়ে ১ কেজি মাছ উৎপাদন করতে ২/৩ কেজি খাদ্য দরকার হয়। হবে খাবারের সাথে সাথে কাঁচা গোবর, মুরগীর বিষ্ঠা ও প্রচুর ঘাস দিলে খাদ্য খরচ অনেক কমে যায়। 
উৎপাদন কেবল খাঁচায় চাষ করলে অল্প মূলধনে, অল্প সময়, অল্প খরচে অধিক উৎপাদন সম্ভব হয়। উন্নত বিশ্বে বিজ্ঞানীরা আজ প্রতি বর্গমিটা প্রতি মাসে ১০ কেজি মাছ উৎপাদন এ হিসাবে দাঁড়ায় প্রতি বিঘায় মাসে ১০ মেট্রিক টন বা ১০ হাজার কেজি। এর মদ্যে স্থায়ী খরচ ৬ হাজার ৫শ' টাকা বাদ দিলে মোট মুনাফা ১৯ হাজার ৬শ' ৫০ টাকা প্রতি খাঁচায় প্রতি ৩/৪ মাসে।
খাঁচায় মাছ চাষ করতে রাত-দিন সব সময় দারোয়ান অবশ্যই থাকতে হবে। কেননা অল্প জায়গায় এত অধিক মাছ থাকায় চুরির সম্ভাবনা বেশি। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে এই চাষ বাংলাদেশে অধিক লাভজনক। যেহেতু এই চাষ ব্যবস্থটি আমাদের দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
খাঁচা তৈরির সম্ভাব্য খরচমাছের উৎপাদন ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি খাঁচা তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১৬ হাজার টাকা, যা চার-পাঁচ বছর স্থায়ী হয়। মাছের আকার ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম হলেই বিক্রির উপযোগী হয়, আর এ ক্ষেত্রে সময় লাগে মাত্র ছয় মাস। এ ক্ষেত্রে প্রতি ঘনমিটারে কমপক্ষে ৩০ কেজি মাছ উৎপাদিত হয়ে থাকে। সাধারণত চাষকৃত পোনার ওজন ১০ গ্রাম হয়ে থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে আকারে বড় অর্থাৎ ২০ থেকে ৩০ গ্রাম ওজনের পোনা চাষ করলে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায়। খাঁচা তৈরি, পোনার মূল্য, খাদ্য, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রতি ১০টি খাঁচা থেকে প্রতি ছয় মাসে কমপক্ষে এক লাখ ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।
সম্ভাবনা পতিত জমিতে (নদী, হাওর, বিল) মাছের উৎপাদন সাধারণ জমিতে স্থাপিত খামারের তুলনায় প্রায় ১৩ গুণ বেশি হয়। সাধারণ পুকুরে বা খামারে এক একরে যে পরিমাণ মাছ চাষ করা যায় সেই পরিমাণ মাছ উৎপাদনের জন্য খাঁচায় মাত্র ১৮০ ঘনমিটার জায়গাই যথেষ্ট। খাঁচায় যেখানে প্রতি হেক্টরে তিন লাখ কেজি মাছ উৎপাদন সম্ভব, সেখানে পুকুরে বা খামারে প্রতি হেক্টরে মাত্র ২৩ হাজার কেজি মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। বর্তমানে দেশের মাছের চাহিদা প্রতি বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন। খাঁচায় মাছ চাষ করলে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে মাত্র ১০ হাজার হেক্টর জমিই যথেষ্ট, যা আমাদের দেশের পতিত মোট নদ-নদীর পানির মাত্র শতকরা ০.২৫ ভাগ।


একুরিয়ামে মাছ পালনের পদ্ধতি


সূচনা কথা মানুষ মূলতঃ খুবই সৌখিন। তার বেসিক চাহিদা গুলো পূরণ হওয়ার পর সে তার জীবন আর তার পরিবেশ সাজাতে চায় সুন্দর কিছু দিয়ে। যেটা তার ও তার আশেপাশের মানুষের নজর কাড়ে। আর এক্ষেত্রে দেখা যায় একেক মানুষের একেক রকম শখের। কিন্তু এই সৌখিনতার পাশাপাশি চলে আসে সেই জিনিসটার প্রতি যত্ন এবং রক্ষনাবেক্ষন। যার জন্য মানুষকে অনেক সময় দিতে হয় সেটার পিছনে। যেমন, বাগান, শো-পিস, কলম, বই, ডায়েরী, দেয়াল ছবি, গাড়ী বা অনেক কিছুই হতে পারে।

ঠিক তেমনি একটি সখের জিনিস হলো, একুরিয়াম। অনেকে বাসায় মুরগী, কুকুর, বিড়াল বা মাছ পালতে ভালোবাসেন। যাই হোক, আমি একুরিয়াম নিয়ে আলোচনা করতে চাই। আমাদের শহর কেন্দ্রিক জীবনধারায় ড্রইং রুমে একটি একুরিয়াম সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে তোলে নিঃসন্দেহে। ঘরের কোণের একুরিয়ামে জীবন্ত বাহারী রং এর মাছ গুলো যখন সাঁতার কাটে তখন দেখতে ভালই লাগে। কিন্তু একটা সুন্দর, চকচকে, মাছের জন্য সু-স্বাস্থ্যকর একুরিয়াম মেইন্টেন করতে হলে সেটার পিছনে অনেক শ্রম দিতে হবে। এটা ছাড়াও আপনাকে হতে হবে ধৈর্য্যশীল।
যারা বাড়ীতে একুরিয়ামে মাছ পালেন তাদের মধ্যে বড় একটা অংশ একসময় হোপলেস হয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তখন সেই ভাঙ্গা একুরিয়ামের জায়গা হয়ে বাড়ীর স্টোররুমে বা গ্যারেজের কোণায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে আগ্রহ ও ধৈর্য্য বজায় রাখাটাও অনেক সময় টাফ হয়ে যায়।
কারণ আমি দেখেছি, বেশীরভাগই মানুষ একুরিয়ামের ব্যাপারে সঠিক তথ্য পায়না। অনেকটা বেসিক সেন্সের উপর ভিত্তি করে মাছ পালেন একুরিয়ামে। শেষে মাছ অসুখ হয়ে মারা যায়। আর কোন একুরিয়ামের দোকান থেকে আপনি এই মাছগুলোকে স্বাস্থ্যবান রাখার জন্য কোন হেল্পই পাবেন না। কারণ এখানে একটা ব্যাবসায়িক ব্যাপার থাকে বোধ হয়।
কেমন একুরিয়াম কিনবেন আপনার যখন একুরিয়াম কেনার সিদ্ধান্ত নিবেন তখন প্রথমেই আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে আপনার ঘরের মাপ। কারণ বেশী বড় বা বেশী ছোট একুরিয়াম আপনার ঘরে বেমানান লাগতে পারে। ধরে নিলাম একটি সাধারন ঘরের মাপ হতে পারে ১০ ফুট বাই ১৫ ফুট। আর তাই এইধরনের রুমে ২ফুট বাই ১ফুট বা ২.৫ফুট বাই ১.৫ফুট একুরিয়ামই আদর্শ। কাঁচের পুরুত্ব এখানে একটা ব্যাপার। তবে বড় একুরিয়ামের ক্ষেত্রে পুরু কাঁচ নেয়াটাই ভালো।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একুরিয়ামের বেশ অনেক দোকান আছে। তবে এর সমাহার দেখা যায় কাঁটাবনে। এখানে অনেক দোকান আছে ক্লাষ্টারড হয়ে। একুরিয়ামের ষ্ট্যান্ড সহ একটা (উল্লেখিত সাইজের) একুরিয়াম আপনি একহাজার টাকায় কিনতে পারবেন। তারপর তাতে বিভিন্ন উপাদান যোগ করতে হবে। যেমন এখানে লাগবে পাথর কুঁচি, ফিল্টার, এয়ার মোটর, রাবারের ফ্লেক্সিবল পাইপ, এয়ার এক্সিকিউটর। সাধারণ সাইজের একুরিয়ামের জন্য প্রায় দশ কেজি পাথর কুঁচির (প্রতি কেজি ১৫-২০টাকা) প্রয়োজন। এয়ার মোটরের দাম (সাধারন মানের) প্রায় ২৫০-৬৫০ টাকা, ফ্লেক্সিবল পাইপ ১০ টাকা গজ, এয়ার এক্সিকিউটর ১০০-২৫০ টাকা, ফিল্টার ১০০ টাকায় পাওয়া যায়। এটাই একটি একুরিয়ামের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এর পরে যেকেউ পছন্দের বিভিন্ন ডেকোরেশন আইটেম দিয়ে তার একুরিয়াম সাজাতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে একুরিয়ামের সাইজ একটা ব্যাপার সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আপনি আপনার একুরিয়ামে আলো জ্বালাতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনি এনার্জি সেভিং বাল্ব ব্যাবহার করতে পারেন। আরেকটু ভালো হয় হ্যালোজেন বাল্ব পাওয়া যায় যেটা দেখতে একেবারে চিকন এবং আলোটাও কিছুটা বেগুনী। যেটা একুরিয়ামের দোকানে ইউজ করা হয়। যার জন্য মাছের কালার গুলো খুব সুন্দর লাগে বাহির থেকে।
আরেকটি জিনিস বেশ প্রয়োজন যেটা আমরা বেশীরভাগই অবহেলা করে যাই। তা হলো একটি ইলেকট্রিক ওয়াটার হিটার। এটা পানিকে মাঝে মাঝে হালকা উষ্ণ রাখে। কারণ মাছ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে বেশী গরম ও ঠান্ডা পানিতে। যদিও পানি বেশী গরম হওয়ার সম্ভাবনা নাই তবে ঠান্ডা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, বৃষ্টির দিনে বা শীতের দিনে। এক্ষেত্রে একটা ওয়াটার হিটার ১০০-৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। ৫০০টাকায় পাবেন অটো ওয়াটার হিটার।
একুরিয়ামে পাথর কুঁচির নিচে একটি ওয়েট ডাষ্ট ফিল্টার রাখতে হয়। তার সাথে একটি এয়ার এক্সিকিউটর থাকে যেটা দিয়ে বাতাস বের হবার সময় ভিতরে কিছুটা উর্দ্ধোচাপের সৃষ্টি হয়। যার ফলে ময়লা গুলো খুব ধীরে ধীরে পাথরের ভিতর দিয়ে ঐ ফিল্টারের নিচে গিয়ে জমা হয়। সেক্ষেত্রে একুরিয়ামে সবসময়ের জন্য এই যন্ত্রটি চালিয়ে রাখতে হবে।
একুরিয়ামের মাছ আমাদের দেশে একুরিয়ামে রাখার মত অনেক মাছ পাওয়া যায়। যেমন: গোল্ডফিশ, এঞ্জেল, শার্ক, টাইগার বার্ব, ক্যাট ফিশ, ঘোষ্ট ফিশ, মলি, গাপ্পি, ফাইটার (বেট্টা), সাকার সহ আরো অনেক রকম মাছ। তবে এখানে উল্লেখিত মাছ গুলোর মধ্যে গোল্ডফিশই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। তাই আমরা আলোচনায় বেশীরভাগ গোল্ডফিশ নিয়েই আলোচনা করবো।

গোল্ডফিশের রয়েছে মোট ১২৫ প্রজাতি। তাই আমাদের পালন করা বেশীভাগ মাছই গোল্ডফিশ প্রজাতির। যেমন: কমেট, ওয়াকিন, জাইকিন, সাবানকিন, ওরান্ডা, ব্ল্যাক মোর, ফান্টাইল, রুইকিন, ভেইল টেইল, রানচু ইত্যাদি। কিন্তু দেহের কাঠামো হিসেবে গোল্ডফিশ দুইরকম। ডিম্বাকৃতি ও লম্বা দৈহিক গঠন হয়ে থাকে। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার দিক দিয়ে লম্বা দৈহিক কাঠামোর গোল্ডফিশ গুলো শক্ত হয়ে থাকে।

গোল্ডফিশ শীতল (সাধারন তাপমাত্রার) পানির মাছ। তবে এরা হালকা গরম পানিতেও থাকতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে পানির তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার ফলে এরা মারাত্বক অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। তবে শীতকালে এরা একটু ধীরগতির হয়ে যায় এবং খাবার কম খায়। তখন এরা একুরিয়ামের নীচের দিকে থাকতে পছন্দ করে। একটা গোল্ডফিশ পূর্ণজীবন প্রায় ১০ বছরের বেশীও হতে দেখা যায়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এটা বেশীও হতে দেখা গেছে। গোল্ডফিশ খুবই শান্ত প্রকৃতির একটা মাছ। তবে একুরিয়ামে কোন নতুন মাছ আসলে কখনও কখনও কোন কোন গোল্ডফিশকে একটু উশৃংখল হতে দেখা যায়। তবে এটা খুবই কম হয়। আর যদি এমন দেখা যায় তবে ২৪-৪৮ ঘন্টার মধ্যে এ সমস্যা দুর হয়ে যায়।
কেউ কেউ একুরিয়ামে ছোট শৈবাল বা জলজ উদ্ভিদও রাখেন। এটা আসলে ডেকোরেশনের চেয়ে অন্য জায়গায় তাৎপর্য আছে বেশী। এটা এক ধরনের নাইট্রোজেন সাইকেলের কাজ করে। মাছের বর্জ্য থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেনাস যৌগ নির্গত হয়। কার্বণ-ডাই-অক্সাইড সাধারনত বুদবুদ হিসেবে বের হয়ে যায় আর বাকীটুকু একুরিয়ামের শৈবাল দ্বারা ফটোসিনথেসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাবহৃত হয়। নাইট্রোজেনাস যৌগ প্রথমে এমোনিয়া, এমোনিয়া থেকে নাইট্রেটে পরিনত হয়। নাইট্রেট শৈবাল দ্বারা শোষিত হয়।
মাছের রোগ ও তার চিকিৎসা প্রথমেই মনে রাখতে হবে আপনি আপনার মাছের যেকোন রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে দোকানদারের কাছ থেকে কোন রকম হেল্প পাবেন না। আর পেলেও ভুল তথ্য পাবেন। যদি আপনার সাথে সেই দোকানদারের খুবই হৃদ্যতা থাকে তবে সেটা ভিন্ন কারণ। আপনাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্লাষ্টিকের বোতলে থাকা তিনটি ঔষধ দিবে। যেগুলো কোন রোগের ঔষধ নয়। ওগুলো একুরিয়াম মেইন্টেন করার জন্য কিছুদিন পর পর প্রয়োগ করতে হয়। অর্থাৎ একুরিয়ামের পরিবেশ ভালো রাখার জন্য দিতে হয়। কিন্তু রোগ ও তার চিকিৎসা কিন্তু ভিন্ন জিনিস।
আমাদের দেশের আবহাওয়ায় যে কয়েকটি রোগ হতে পারে মাছে শুধু সেগুলোই আলোচনা করবোঃ
লেজ পচা: মানুষের ক্ষেত্রে "জন্ডিস ইন নাথিং বাট এ সিম্পটম অব এ ডিজিজ"। মানে জন্ডিস কোন অসুখ না কিন্তু একটা অসুখে পূর্বাভাস বটে। ঠিক তেমনি, লেজ পচা কোন নির্দিষ্ট অসুখ না তবে কোন শক্ত অসুখের পূর্ব লক্ষণ। তবে এই রোগের চিকিৎসা আছে। এই রোগে মাছের লেজে বা পাখনায় একটা ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এটি একটি ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন। তবে এটা কখনও কখনও ফাংগাল ইনফেকশনের জন্যও হতে পারে। তবে ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন হলে সেটার প্রকোপ অনেক বেশী হয়। এর ফলে লেজ আস্তে আস্তে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। শেষে এমন আকার ধারন করে যেটা দেখতে অনেকটা তুলার শেষ অংশের মত মনে হয়। এই রোগ ধীরে ধীরে দেহেও আক্রমন করে। তবে এটা যদি লেজের গোড়াকে আক্রমন করার আগেই কিউর করে ফেলা হয় তবে ক্ষতিগ্রস্থ লেজের টিস্যু গুলোর কাছ থেকে আবার টিস্যু গজানো শুরু করে কোন কোন ক্ষেত্রে।

চিকিৎসাঃ যদি দেখা যায় একুরিয়ামের কোন মাছ এই রোগে অল্প একটু কেবল আক্রান্ত হলো তখন সেটাকে তুলে অন্য জারে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়াই ভালো। আর যদি এমন হয় যে বেশীভাগ মাছই একই অবস্থা। তবে সাথে সাথে পানি চেইঞ্জ করে সেগুলো চিকিৎসা দিতে হবে। তবে নিয়মিত একুরিয়াম সল্ট দেয়া হেরফের হলে এমন রোগ হতে পারে বা অন্যকোন কারনেও হতে পারে। 
এমন দেখলে এন্টিবায়োটিক ঔষধ দিতে হবে। এক্ষেত্রে ভালো কাজ করে টেট্রাসাইক্লিন। তবে যদিও টেট্রাসাইক্লিনটা একটু কড়া মাত্রার ঔষধ তাই কম ইনজুরি হলে ডক্সি-সাইক্লিন ও ক্ষেত্র বিশেষে অক্সি-সাইক্লিন গ্রুপের যেকোন ঔষধ দিলেও চলে। একটি ক্যাপসুল খুলে তার পাওডারটি পানিতে ফেলে দিতে হবে। এভাবে প্রায় ছয়/সাত দিন রেখে আবার পানি চেইঞ্জ করতে হবে। 
এই ঔষধ ব্যাবহারের ফলে পানি হলুদ বা হালকা লাল হতে পারে। তাতে কোন সমস্যা নাই। আর পানির উপরে একটা ফেনা জমবে যেটা মাঝে মাঝে একটা চামচ দিয়ে পরিষ্কার করে দেয়া ভালো।
হোয়াইট স্পট বা আইচঃ কখনও কখনও মাছের গায়ে একরকম সাদা দাগ দেখা যায় সেটাকে আইচ বলে। মূলতঃ এটা একটা প্যারাসাইট (পরজীবি)। এটি একটি মারাত্বক রোগ। আক্রান্ত মাছের সারা গায়ে খুব তাড়াতাড়ি এটা বিস্তার করে। এবং গায়ে লেগে থাকে। ধীরে ধীরে মাছ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এই রোগে মাছের মৃত্যু হতে পারে। এই পরজীবিগুলোর জীবনচক্র প্রায় দশদিনের মত।

চিকিৎসাঃ
ফরমালিন, ক্লোরাইড লবন এবং মেলাসাইট গ্রিন এই রোগের উপশমের জন্য ব্যাবহার করতে হয়। আক্রান্ত মাছকে তুলে ক্লোরাইড সল্ট ও ফরমালিন মেশানো পানিতে কিছুক্ষণ চুবিয়ে রাখতে হয়। দিনে দুইএকবার করলে এর ভালো ফল পাওয়া যায়। কিন্তু এই রোগের চিকিৎসা সাধারনত তিনদিন করলেই এর ফলাফল পাওয়া যায়। তবে একেবারে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াই ভালো।
এংকরঃএইটা একটা কমন রোগ মাছের। অনেকসময় দেখা যায়, মাছের দেহের শেষ প্রান্তে অর্থাৎ লেজ শুরু হওয়ার আগের অংশে অথবা পেটের নিচে পাখনার কাছে একটা লাল ফুসকুরির মত দেখা যায় (অনেকটা ব্রনের মত)। এই রোগটাকে এংকর বলে। এই লাল ফুসকুরিটি আস্তে আস্তে বড় হয়। কিছুদিন পরে এখান থেকে একটা ছোট সুতার মত বের হয়। সেটা দেখতে অনেকটা গাছের শিকড়ের মত।
চিকিৎসাঃ
এই রোগের চিকিৎসাও লেজ পচা রোগের মত (যা আগের পর্বে আলোচনা করা হয়েছে)। এন্টিবায়োটিক এপ্লাই করতে হয়। অর্থাৎ টেট্রাসাইক্লিন। ঔষধ ব্যাবহারের কিছুদিনের মধ্যে এটি ঠিক হয়ে যায়। তখন ঐ ছোট শিকড়ের মত অংশটি পড়ে যায়।

কষা রোগঃ এই রোগ হলে মাছের পেট ফুলে যায়। মাছ আর কোন খাবার খেতে চায় না। মাছের মল ত্যাগে কষ্ট হয়। কষা হয়ে যায়।
চিকিৎসাঃ আসলে এই রোগের চিকিৎসা হলো মাছের খাদ্যাভাস চেইঞ্জ করা। আমরা সবাই বাজার থেকে প্যাকেট খাবার কিনে খাওয়াই। সেখানে লাল ও সবুজ রং এর দানা থাকে। কিন্তু কিছুদিন পর পর এগুলো পরিবর্তন করা ভালো। একুরিয়ামের দোকানে জীবন্ত ওয়ার্ম পাওয়া যায় সেটা এনে মাঝে মাঝে খাওয়াতে পারেন। এবং মৃত ওয়ার্ম প্রসেস করা অবস্থায় কৌটাতে পাওয়া যায়। সেটাও মাঝে মাঝে দেয়া যেতে পারে। যদিও এগুলোর দাম একটু বেশী। বাজারে এক রকম গোলাপী রংএর লিকুইড পাওয়া যায় যেগুলো মাছের ভিটামিন নামে পরিচিত। দুই/তিন ফোঁটা দিয়ে খাবারটা কিছুক্ষণ ভিজিয়ে তারপর খেতে দিলে ভালো হয়।
এগুলিই সাধারনত আমাদের আবহাওয়ায় মাছের অসুখ হয়ে থাকে। মূলতঃ সুস্থ্য মাছের জন্য একটি সুস্থ্য একুরিয়াম প্রয়োজন। তারজন্য প্রয়োজন নিয়মিত যত্ন করা। পানি কিছুদিন পর পর বদল করা। নতুন পানিতে পরিমান মত একুরিয়াম সল্ট দিতে হবে। আপনি ট্যাপের পানিই দিতে পারেন। আর যেসব স্থানে পানিতে আয়রন বেশী সেসব জায়গায় পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে থিতিয়ে দিতে পারেন।
একুরিয়ামের পরিচর্যা
যেকারণে আমরা একুরিয়াম রাখতে চাইনা
১) পরিষ্কার করা ঝামেলা
২) কিছুদিন পর পর মাছের রোগ ও মাছের মৃত্যু
পানি পরিষ্কার করতে আপনাকে সাহায্য করবে
১) আপনার ট্যাপ থেকে একুরিয়াম পর্যন্ত একটি বাবারের পাইপ।
২) একুরিয়ামের পানি বের করার জন্য প্রায় পাঁচ ফুট লম্বা রাবারের পাইপ।
পানি পরিবর্তনঃ পানি পরিবর্তনের আগে নেট ব্যাবহার (মাছ ধরতে হাত ব্যাবহার না করাই ভালো) করে মাছকে একুরিয়াম থেকে তুলে নিয়ে আরেকটি পানি দেয়া জারে রাখবেন। তারপর পাঁচ ফুট লম্বা একটি রাবারের পাইপ (হার্ডওয়্যারের দোকানে ওয়াটার লেভেল নামে পাওয়া যায়) একুরিয়ামের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে অপর প্রান্তে আপনার মুখ লাগিয়ে অল্প একটু বাতাস টেনে ছেড়ে দিন নিচে রাখা বালতির ভিতরে। একসময়ে পানি সব বালতিতে পড়ে গেলে কাছাকাছি কোন ট্যাপ থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি একুরিয়ামে দিন। এভাবে পানি পরিবর্তন সবচেয়ে সহজ।
যেখানে পাওয়া যাবেঃ কাঁটাবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেট অ্যাকুরিয়ামের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। অ্যাকুরিয়ামে মাছ পুষতে যা যা দরকার তার সবই পাওয়া যায় এখানে। এর মধ্যে আছে অ্যাকুরিয়াম বক্স, মাছ, খাবার, ওষুধ প্রভৃতি। ঢাকার নিউমার্কেট, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অ্যাকুরিয়াম-সামগ্রীর দোকান আছে।
কাঁটাবন মার্কেটের অ্যাকুরিয়াম-সামগ্রীর দোকান লাভ অ্যান্ড হবির কর্ণধার আবদুল হামিদ বকুল বলেন, ‘অ্যাকুরিয়ামের যে মাছ এখন আমাদের দেশে পাওয়া যায়, একটা সময় তার প্রায় সবই থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চায়না, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হতো। কিন্তু এখন প্রায় ৯০ শতাংশ মাছই আমাদের দেশের বরিশাল, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে চাষ হচ্ছে এবং সেসব মাছই এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অ্যাকুরিয়ামের বাজারে বিক্রি হচ্ছে। তাই কেবল শখ কিংবা সৌন্দর্যবর্ধন নয়, চাইলে অ্যাকুরিয়াম মাছের চাষ ও ব্যবসা করে যেমন সাবলম্বী হওয়া যাবে, তেমনি বিদেশে রঙিন মাছ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করা যাবে।
অ্যাকুরিয়ামে পোষার জন্য কাঁটাবনে যেসব মাছ পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে সিলভার শার্ক, এলবিনো শার্ক, টাইগার শার্ক, রেইনবো শার্ক, টাইগার বার্ব, রোজি বার্ব, গোল্ড ফিশ, অ্যাঞ্জেল ফিশ, ক্যাট ফিশ, সাকিং ক্যাট, কমেট, মলি, ফলি, গপ্পি, ব্লু-গোরামি, সিলভার ডলার, অস্কার, ব্লু-আকারা, টেলিচো, কৈ কার্প, টাইগার কৈ কার্প, ব্ল্যাক মুর, সোটটেল, প্লাটি, এরোনা, ফ্লাওয়ার হর্ন, হাইফিন নোজ, ব্ল্যাক গোস্ট, সিসকাসসহ বিভিন্ন প্রজাতি। এসব মাছ প্রতিজোড়া ৫০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনা যাবে। আবার কিছু মাছের দাম বেশিও হয়। তবে দাম অনেকটা নির্ভর করে ছোট-বড় ও প্রজাতির ওপর। 
কাঁটাবনের ব্যবসায়ীরা জানান, মাছের খাবার সাধারণত দুই ধরনের হয়। শুকনো খাবার ও পোকামাকড়। প্রতি ১০০ গ্রাম খাবারের দাম ২৫ থেকে ৫০ টাকা। অ্যাকুরিয়ামে মাছের অসুখ-বিসুখ হলে তার ওষুধও কাঁটাবন থেকে কেনা যাবে। অবশ্য মাছের অসুখের জন্য তেমন পেশাদার চিকিৎসক নেই বলে ব্যবসায়ীরা জানান। অ্যাকুরিয়াম বক্স নিজের পছন্দমতো বানিয়েও নেওয়া যায়। এ ছাড়া বাজারে ছোট-বড় বিভিন্ন মাপের অ্যাকুরিয়াম বক্স কিনতে পাওয়া যায়। দুই থেকে সাড়ে তিন ফুট আকারের অ্যাকুরিয়াম বক্সের দাম এক হাজার ২০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া ছোট কাচের পাত্রেও রঙিন মাছ পোষা যায়। এসব পাত্রের দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা। অ্যাকুরিয়ামে মাছ রাখতে হলে এয়ার পাম্প, ছোট নেট, পাথরের টুকরাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম লাগে।
অ্যাকুরিয়ামে মাছ পুষতে হলে কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন, মাছের খাবার নিয়মিত দিতে হবে। সপ্তাহে একদিন অ্যাকুরিয়ামের পানি পাল্টাতে হবে।