লাকসাম মিডিয়া গ্যালারী

#htmlcaption1 লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected lakshamlive Stay Connected

নাট্যকর্মী নেবে লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস

যোগাযোগ এম এ জলিল....+8801716496603 এম সোহেল......+8801825399243 E-mail...lakshammultimediahouse@gmail.com www.facebook.com/lakshammultimediahouse www.lakshamlive.blogspot.com

লাকসাম উপজেলা.

লাকসাম উপজেলা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। কুমিল্লা সদর থেকে মাত্র ২৯ কিলোমিটার দক্ষিণে ডাকাতিয়া নদীর তীরে এই উপজেলাটি অবস্থিত। বর্তমানে লাকসাম একটি প্রথম শ্রেণীর পৌরসভা। লাকসাম শহরটি বাণিজ্যের শহর হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের বৃহত্তম পাঁচটি রেলওয়ে জংশনের মধ্যে একটি এখানে অবস্থিত। লাকসাম থানাকে উপজেলায় রুপান্তরিত করা হয় ১৯৮২ সালে।

আকর্ষণীয় স্থান সমূহ.

অনেকেই এক দিনের ছুটিতে ঘুরার জন্য প্লেন খুঁজে বেরায়, আর আমি নিয়ে এলাম একদিন ঘুরার দারুণ এক প্লেন। প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরতে আসে কুমিল্লায়। কুমিল্লাতে বহুসংখ্যক পর্যটন আকর্ষন রয়েছে। কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি পাহাড়ে একটি সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। এখানে রয়েছে শালবন বিহার, কুটিলা মুড়া, চন্দ্রমুড়া, রূপবন মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, সতের রত্নমুড়া, রাণীর বাংলার পাহাড়, আনন্দ বাজার প্রাসাদ, ভোজ রাজদের প্রাসাদ, চন্ডীমুড়া প্রভৃতি।

ছোট নাটিকা.

জুনিয়র প্রেমিকলেখাঃ রাজিব (দরিদ্র বালক)ঠাস করে একটা শব্দ, ডান গালে তীব্র ব্যথা, চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি! চোখ বন্ধ করে গালে হাত দিয়ে চুপ করে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর চোখ খুলে দেখি মেয়েটি সামনে এখনো দাঁড়িয়ে আছে! চশমা পরা, রাগী চেহারা, রাগে মুখ লালচেহয়ে আছে! কিছু একটা হয়েছে, কিহয়েছে?এসো একটু পেছনে যাই..ব্যস মাত্র পাঁচ মিনিট...এসো.."

লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস.

লাকসাম মাল্টি-মিডিয়া হাউস

Showing posts with label হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী. Show all posts
Showing posts with label হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী. Show all posts

Sunday, 7 May 2017

শবে মেরাজের বিস্ময়কর ঘটনা

জাকির হোসাইন আজাদী

মানবকুলের শিরোমনি এবং নবী ও রসূলদের মুকুটমনি হযরত মুহাম্মদ (স.) একদা মক্কাতে শিআবে আবূ ত্ব-লিবে অবস্থিত তাঁর চাচাতো বোন উম্মে হা-নীর ঘরে এশার নামায পড়ে শুয়েছিলেন। তখন তাঁর একপাশে নিদ্রিত ছিলেন প্রাণপ্রিয় চাচা হামযা এবং অন্যপাশে ঘুমাচ্ছিলেন তাঁর অন্তরঙ্গ চাচাতো ভাই জাফর (রা.) (ফতহুল বারী)। অতঃপর তাঁর ঘরের ছাদ ফুঁড়ে জিবরীল আমীন ও মীকায়ীল (আ.)-এর আগমন তাঁর কাছে হয়। তখন তিনি ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে ছিলেন। অতঃপর জিবরিল তাঁকে ঐ ঘর থেকে বের করে মসজিদুল হারামের দিকে হাত্বীমের কাছে নিয়ে আসেন। তখন তাঁর মধ্যে ঘুমের ভাব ছিল। এরপর জিবরীল তাঁর সীনা থেকে নাভীর ওপর পর্যন্ত ফেড়ে এবং তাঁর বুক ও পেট থেকে কিছু বের করে সেটাকে যমযম পানি দিয়ে ধুয়ে তাঁর পেটটাকে পাকসাফ করে দেন। তারপর তিনি সোনার একটি তশ্তরী আনেন। যা ঈমান ও হিকমত (শরীআতী জ্ঞান) দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তদ্বারা তিনি তার সীনাটাকে ভরে দেন এবং তার ফাড়া অংশটা ঠিকঠাক করে দেন (বুখারী ১ম খন্ড, ৫৪ পৃষ্ঠা, মুসলিম ১ম খণ্ড, ৯২ পৃষ্ঠা, মিশকাত ৫২৬-৫২৭ পৃষ্ঠা)। তাঁর বুক অপারেশনের কারণে তিনি তন্দ্রালু অবস্থায় যখন কাবা শরীফের নিকটবর্তী হিজর তথা হাত্বীমে ছিলেন তখন জিবরীল তার পায়ে টোকা মারেন। তিনি উঠে বসে কাউকে দেখা না পেয়ে শোবার জায়গায় ফিরে যান। আবার জিবরীল তাঁর পায়ের পাতায় টোকা মারেন। ফলে তিনি উঠে বসেন। এবার জিবরীল তাঁর হাতটা ধরেন। অতঃপর তিনি তার সাথে উঠে দাঁড়ান। তারপর মসজিদুল হারামের দরজার দিকে তিনি রওয়ানা হন। ওখানে একটি সাদা জন্তু ছিল। যা গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি ছিল। তার দুটি উরুর মধ্যে দুটি ডানা ছিল। যা তার পা দুটির কাছাকাছি ছিল (তফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ৩য় পৃষ্ঠা)। ঐ জন্তুুটির নাম বুরা-ক্। ওর বর্ণনা সা’লাবীর দুর্বলসূত্রে আছে যে, ওর চেহারাটা মানুষের চেহারার মত। ওর পায়ের ক্ষুরটা জন্তুদের পায়ের ক্ষুরের মত। ওর লেজটা বলদের লেজের মত। ওর আগেপিছেটা ঘোড়ার মত। ওকে যখন রাসূলুল্লাহর কাছে আনা হয় তখন সে লাফালাফি করতে থাকে। ফলে জিবরীল তাকে ছুঁয়ে বলেন, হে বুরাক! তুমি মুহাম্মদ (স.) দেখে লাফালাফি করো না। আল্লাহর কসম! তোমার ওপর এমন কোন ফেরেশ্তা চড়েনি এবং এমন কোন প্রেরিত নবীও সওয়ার হননি যিনি মুহাম্মদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন এবং তিনি আল্লাহর নিকটেও তাঁর চেয়ে মর্যাদাবান হতে পারেন (তফসীরে কুরতুবী, ১০ম খণ্ড, ১৩৬ পৃষ্ঠা) তিরমিযীতে আনাসের বর্ণনায় আছে, তখন বুরাকটি ঘামেতে ভিজে যায়। ইবনে ইসহাকের বর্ণনায় আছে, বুরাকটি তখন কাঁপতে থাকে। পরিশেষে সে যমীনে ঠেকে যায়। অতঃপর রসূলুল্লাহ (স.) তাতে সওয়ার হন। নাসায়ীতে আনাসের বর্ণনায় আছে, ঐ বুরাকটিকে অন্য নবীদের জন্যও নিয়োজিত করা হতো। বিশিষ্ট তা-বিয়ী সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব বলেন, এই বুরাকটি সেই জন্তু, যাতে চড়ে ইবরাহীম নবী (সিরিয়া থেকে মক্কায় তার পুত্র) ইসমায়ীলকে দেখতে আসেন। ঐ বুরাকটির দৃষ্টি যতদূর যেত ততদূরে তার পা পড়তো (ফাতহুল বারী) আনাসের বর্ণনায় ইবনে জারীর বলেন, বুরাকে চড়ার পর রসূলুল্লাহ (স.) জিবরীলের সাথে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে রওয়ানা হন। হঠাত্ রাস্তার একদিকে তিনি একটি বুড়ীকে দেখতে পান। তিনি (স.) বলেন, এটা কে? হে জিবরীল! তিনি বলেন, চলুন, হে মুহাম্মদ! তিনি চলতে থাকেন। আবার রাস্তার ধারে একটি জিনিস তাঁকে ডাকলো, আসুন, হে মুহাম্মদ! তখন জিবরীল তাঁকে বলেন, চলুন, হে মুহাম্মদ! তাই তিনি চলতে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কিছু সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত্ হল। তাঁরা বললেন, আসসালা-মু আলাইকা, হে হা-শির (যাঁর পরে কেউ নেই)। তখন তাঁকে জিবরীল (আ.) বলেন, আপনি সালামের জওয়াব দিন। তাই তিনি সালামের জওয়াব দিলেন। তারপর তিনি দ্বিতীয় ও তৃতীয়জনের সাক্ষাত্ পেলেন। তাঁদেরকেও তিনি ঐরূপ বললেন। পরিশেষে তিনি বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে গেলেন। অতঃপর তাঁর কাছে পানি ও শারাব এবং দুধ পেশ করা হল। তখন রসূলুল্লাহ (স.) দুধটাকে গ্রহণ করলেন। অতঃপর জিবরীল আলাইহিস সালাম বলেন, আপনি স্বভাবজাত প্রকৃতিকে পেয়ে গেছেন। আপনি যদি পানিটা পান করতেন তাহলে আপনি ডুবে যেতেন এবং আপনার উম্মতও ডুবে যেত। আর আপনি যদি শরাব পান করতেন তাহলে আপনি পথভ্রষ্ট হতেন এবং আপনার উম্মতও বিভ্রান্ত হয়ে যেত। তারপর জিবরীল বলেন, সেই বুড়ীটা যাকে আপনি রাস্তার ধারে দেখেছিলেন সে হচ্ছে পৃথিবীর সেই অংশ যতটা বয়স এই বুড়ীটার বাকী আছে। আর সে চেয়েছিল যে, আপনি তার প্রতি আকৃষ্ট হন। সে ছিল আল্লাহর দুশমন ইবলীস। সে চেয়েছিল যে, আপনি তার দিকে ঝুঁকে যান। আর যারা আপনাকে সালাম দিয়েছিলেন তারা হলেন ইবরাহীম এবং মুসা ও ঈসা (আ.) (তাফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ৫ম পৃষ্ঠা)। হাফেজ ইবনে কাসীর বলেন, এর কোন কোন শব্দে আপত্তি এবং অভিনবত্ব আছে (তাফসীর ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৬ষ্ঠ পৃষ্ঠা)। মুসনাদে বাযযার ও ত্ববারানীতে এবং বাইহাকীর দালা-য়িলুন নুবওঅতে শাদ্দাদ ইবনে আওসের বর্ণনায় আছে যে, রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যখন আমরা খেজুর গাছওয়ালা একটি যমিনে পৌঁছলাম তখন জিবরিল বলেন, আপনি এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। তারপর আমরা বুরাকে চড়লাম। অতঃপর জিবরিল বলেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভাল জানেন। এবার জিবরিল বললেন, আপনি নামায পড়লেন, ইয়াসরিবে (মদীনা শরীফের পুরাতন নাম) তথা ত্বইবাতে। নাসায়ীর বর্ণনায় আছে, এটাই আপানর হিজরতের জায়গা হবে ইন-শা-আল্লাহ! অতঃপর বুরাকটি চলতে লাগলো এবং যেখানে তার দৃষ্টি পড়ছিল সেখানে সে তার পা-টি ফেলছিল। তারপর আমরা একটি জায়গায় পৌঁছলাম। জিবরীল আমাকে বললেন, এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। অতঃপর জিবরীল বললেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বললেন, আপনি মাদ্য়্যান শহরে নামায পড়লেন মূসার গাছের নীচে। অন্য বর্ণনায় আছে, এটা সিনাই পর্বত। যেখানে আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছিলেন। অতঃপর বুরাকটি তার দৃষ্টি পর্যন্ত পা ফেলে চলতে লাগলো। তারপর আমরা একটা জায়গায় পৌঁছলাম। যার সৌধগুলো আমাদের সামনে প্রকাশিত হল। তখন জিবরীল বললেন, এখানে নামুন এবং নামায পড় ুন। তাই আমি নামলাম এবং নামায পড়লাম। তারপর আমরা বুরাকে চড়লাম। অতঃপর জিবরীল বললেন, আপনি কি জানেন, আপনি কোথায় নামায পড়লেন? আমি বললাম, আল্লাহ ভালো জানেন। তিনি বললেন, এটা বাইতুল লাহাম। যেখানে মারয়্যামের পুত্র ঈসা মাসীহের জন্ম হয়েছিল। তারপর বুরাক আমাদের নিয়ে চললো। পরিশেষে আমরা ইয়ামনী দরজা দিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের শহরে ঢুকলাম।

অতঃপর আমি মসজিদটির কিবলার দিকে এলাম। তারপর তিনি ওখানে বুরাকটি বাঁধলেন। তারপর আমি বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসজিদে-আকসায় ঢুকলাম। অতঃপর আমার সামনে নবীদের জমায়েত করা হল। তারপর জিবরীল আমাকে এগিয়ে দিলেন। পরিশেষে আমি তাঁদের ইমামতি করলাম (তফসীর ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, ৭ম পৃষ্ঠা)। বাইহাকির দালায়িলুন নবুওঅতে ও ইবনে আসা-কিরে আবূসায়ীদ খুদ্রীর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, আমি যখন বুরাকে চড়ে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে যাচ্ছিলাম তখন একজন আহ্বানকারী ডান দিক থেকে ডাক দেয়, হে মুহাম্মদ, আমাকে দেখুন। আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো। কিন্তু আমি জওয়াব দেয়নি। তারপর একজন আহ্বানকারী বাম দিক থেকে আমাকে ডাক দেয়, হে মুহাম্মদ! আমাকে দেখুন। আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো, কিন্তু আমি জওয়াব দেয়নি। তারপর আমরা চলতেই থাকি। ইত্যবসরে একটি নারী তার বাহু দুটি উলঙ্গ করে এবং সবরকম সৌন্দর্য যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে তা রয়েছে। অতঃপর সে বলে, হে মুহাম্মদ! আমাকে দেখুন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো। আমি তার দিকে তাকালাম না। পরিশেষে আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে গেলাম। অতঃপর আমি আমার জন্তুটাকে সেই চক্রে বাঁধলাম, যাতে নবীগণ (তাঁদের জন্তুগুলো) বাঁধতেন। তারপর আমি পথে আমাকে আহ্বানকারীদের সম্পর্কে জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, ডাকদিকের আহবানকারীটি ইহুদী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত ইহুদী হয়ে যেত। বামদিকের আহ্বানকারীটি খৃষ্টান। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত খৃষ্টান হয়ে যেতো। আর উলঙ্গ বাহু রংঢং করা নারীটি এই পৃথিবী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত পরকালের উপর এই দুনিয়াকে প্রাধান্য দিত। তারপর আমি এবং জিবরীল বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমাদের প্রত্যেকেই দু-রাকাআত নামায পড়লাম। আবু সায়ীদ খুদরীর (রা.) বর্ণনায় আছে, নবী (স.) বলেন, আমি যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের কর্মসূচি থেকে অবসর পেলাম তখন একটি সিঁড়ি আমার কাছে আনা হল। এর চেয়ে সুন্দর জিনিস আমি দেখিনি। এটাই সিঁড়ি যার দিকে মরণাপন্ন ব্যক্তি চেয়ে থাকে যখন তার কাছে মরণ হাজির হয়। অতঃপর জিবরীল আমাকে তাতে চড়িয়ে দিলেন। পরিশেষে আমি আকাশের দরজাগুলোর মধ্যে একটি দরজার কাছে পৌঁছলাম। যার নাম বা-বুল হাফাযাহ্ তথা সংরক্ষিতকারীদের দরজা। তাতে একজন ফেরেশতা আছে। যার নাম ইসমায়ীল। তার অধীনে বার হাজার ফেরেশতা আছে। ওদের মধ্যকার ফেরেশতার অধীনে বার হাজার করে ফেরেশতা আছে তাফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ১১ পৃষ্ঠা)। বাইহাকীর বর্ণনায় আছে, পৃথিবীর অতি নিকটবর্তী ফেরেশতার নাম ইসমায়ীল। তার সামনে আছে সত্তর হাজার ফেরেশতা। তার প্রত্যেক ফেরেশতার সাথে একলাখ ফেরেশতার বাহিনী আছে। তিনি বলেন, অতঃপর জিবরীল আকাশটির দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। আবার বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হয়, তার কাছে লোক পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আদম (আ.) কে সেই আকৃতিতে দেখা গেল যে-আকৃতিতে আল্লাহ তাকে প্রথম দিনে সৃষ্টি করেছিলেন (তাফসীর ইবনে কাসীর ৩য় খন্ড, ১৩ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাদের ২য় আসমানে চড়ানো হল। অতঃপর জিবরীল দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। তখন বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, তার কাছে (দূত) পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, পাঠানো হয়েছে। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খোলা হল। হঠাত্ আমি দুই খালাতো ভাইকে পেলাম। তারা হলেন, ঈসা ইবনে মারয়্যাম এবং ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়্যা। তারা দু’জন আমাকে স্বাগতম জানালেন এবং আমার ভালোর জন্য দুআ দিলেন (মুসলিম, ১ম খন্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল ৩য় আসমানে চড়লেন। অতঃপর দরজা খোলার আবেদন করলেন। বলা হল কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, তার কাছে দূত পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন হ্যাঁ। এবার বলা হল তাঁকে স্বাগতম। অত:পর কি সুন্দর আগমন এটা। তারপর দরজা খোলা হল। অত:পর যখন আমি (৩য় আকাশে) পৌঁছলাম তখন ইউসুফকে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ। তাকে সালাম করুন। তাই আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জওয়াব দিলেন, তারপর বললেন, সত্ ভাই ও সত্ নবীকে স্বাগতম! (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৫২৭ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণানায় আছে, ইউসুফকে দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে। (মুসলিম ১ম খণ্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। আর এক বর্ণনায় আছে, তিনি পূর্ণিমার চাঁদের মত (তাহযীবু সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড ৯৩ পৃষ্ঠা)।তারপর একে একে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ করলেন।তারপর সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ হলে—জিবরীল (আ.) বললেন, ইনি আপনার বংশ পিতা, তাঁকে সালাম করুন। তাই আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনিও সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন সত্ পুত্র ও সত্ নবীকে স্বাগতম।তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত তোলা হল। অত:পর হঠাত্ দেখলাম, ওর ফলগুলো বড় বড় কলসির মত এবং ওর পাতাগুলো হাতীর কানের মত। তিনি বললেন, এটা সিদ্রাতুল মুন্তাহা। ওখানে ৪টি নদী আছে। দুটি নদী ভেতরমুখী এবং দুটি নদী বাহিরমুখী। আমি বললাম, এ দুটি কি? হে জিবরায়ীল! তিনি বললেন, ভেতরমুখী দুটো জান্নাতের মধ্যকার নদী। আর বাহিরমুখী দু’টি (মিসরের) নীল এবং (ইরাকের) ফোরাত নদী। তারপর আমার জন্য বাইতুল মা’মূরকে তোলা হল। তারপর আমার কাছে কতিপয় পাত্র আনা হল- মদের পাত্র ও দুধের পাত্র এবং মধুর পাত্র। আমি দুধটাকে গ্রহণ করলাম। জিবরীল বললেন, এটাই তো প্রকৃত স্বভাব যার উপরে আপনি আছেন এবং আপনার উম্মতও আছেন (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত, ৫২৭ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণনায় আছে, আমি আসমানে বাইতুল মামুরে পিট ঠেকিয়ে সুন্দরতম পুরুষের বেশে আমাদের বংশ পিতা হযরত ইবরাহীমকে দেখলাম। তার সঙ্গে কিছু লোকও ছিল। আত:পর আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও আমাকে সালাম দিলেন। অতঃপর আমি আমার উম্মতকে দু’টি দলে দেখলাম। একটি ভাগ এমন যাদের দেহে সাদা কাপড় রয়েছে। তারা যেন কাগজের মত। আর একটি ভাগ এমন যাদের দেহে ছাইরং কাপড় রয়েছে। অত:পর আমি বাইতুল মামূরে প্রবেশ করলাম। এমতাবস্থায় আমার সাথে তারাও ঢুকলো যারা সাদা কাপড় পরিহিত ছিল। তারা একপাশে থাকলো। তবে তারা ভার অবস্থায় ছিল। আমি এবং সঙ্গীরা বাইতুল মামূরে নামাজ পড়লাম। তারপর আমি এবং সঙ্গীরা বেরিয়ে এলাম। তিনি (জিবরীল) বলেন, বাইতুল মামূর এমন ঘর যাতে প্রত্যেক দিন সত্তর হাজার ফেরেশ্তা নামাজ পড়েন তারপর কেয়ামত পর্যন্ত তারা ফিরে আসার সুযোগ আর পায় না (বাইহাকীর দালা-য়িলুন নুবুওঅহ্, ২য় খন্ড ১৩৯ পৃষ্ঠা)। (সংক্ষেপিত)

– দৈনিক ইত্তেফাক অবলম্বনে

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনী

জন্মঃ হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ গোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, উনার জন্ম ৫৭০ খৃস্টাব্দে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মন্টগোমারি ওয়াট তার পুস্তকে ৫৭০ সনই ব্যবহার করেছেন। তবে উনার প্রকৃত জন্মতারিখ বের করা বেশ কষ্টসাধ্য। তাছাড়া মুহাম্মদ(সা.)নিজে কোনো মন্তব্য করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি. এজন্যই এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। এমনকি জন্মমাস নিয়েও ব্যপক মতবিরোধ পাওয়া যায় ।যেমন, এক বর্ণনা মতে, উনার জন্ম ৫৭১ সালের ২০ বা ২২ শে এপ্রিল। সাইয়েদ সোলাইমান নদভী, সালমান মনসুরপুরী এবং মোহাম্মদ পাশা ফালাকির গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে শেষোক্ত মতই ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশী নির্ভরযোগ্য। যাই হোক, নবীর জন্মের বছরেই হস্তী যুদ্ধের ঘটনা ঘটে এবং সে সময় সম্রাট নরশেরওয়ার সিংহাসনে আরোহনের ৪০ বছর পূর্তি ছিল এ নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই। তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ এবং মাতা আমেনা । জন্মের পূর্বেই মুহাম্মাদ (স) পিতাকে হারিয়ে এতীম হন । ৬ বছর বয়সে মা আমেনা এবং ৮ বছর বয়সে দাদা আবদুল মোত্তালেব এর মৃত্যুর পর এতীম মুহাম্মাদ (স) এর দায়িত্বভার গ্রহন করেন চাচা আবু তালেব ।

শৈশব  কৈশোর কালঃ তত্কালীন আরবের রীতি ছিল যে তারা মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদের সুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য জন্মের পরপরই দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন। এই রীতি অনুসারে মোহাম্মদকেও হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপর নাম হালিমা সাদিয়া) হাতে দিয়ে দেয়া হয়। এই শিশুকে ঘরে আনার পর দেখা যায় হালিমার সচ্ছলতা ফিরে আসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালনপালন করতে সমর্থ হন। তখনকার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য – শিশু মোহাম্মদ কেবল হালিমার একটি স্তনই পান করতেন এবং অপরটি তার অপর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই বছর লালনপালনের পর হালিমা শিশু মোহাম্মদকে আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায় মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। হালিমাও চাচ্ছিলেন শিশুটিকে ফিরে পেতে। এতে তার আশা পূর্ণ হল। ইসলামী বিশ্বাসমতে এর কয়েকদিন পরই একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে – একদিন শিশু নবীর বুক চিরে কলিজার একটি অংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয়। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সিনা চাকের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।

এই ঘটনার পরই হালিমা মুহাম্মাদকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সাথে কাটান। এই সময় একদিন আমিনার ইচ্ছা হয় ছেলেকে নিয়ে মদীনায় যাবেন। সম্ভবত কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা করা এবং স্বামীর কবর জিয়ারত করাই এর কারণ ছিল। আমিনা ছেলে, শ্বশুর এবং দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌঁছেন। তিনি মদীনায় একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পর মক্কায় ফেরার পথে আরওয়া নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। মাতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে মক্কায় পৌঁছেন। এর পর থেকে দাদাই মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন। মোহাম্মদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে মোহাম্মদের দায়িত্ব দিয়ে যান।

আবু তালিব ব্যবসায়ী ছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদের বয়স যখন ১২ ব্ছর তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার জন্য বায়না ধরলেন। প্রগাঢ় মমতার কারণে আবু তালিব আর নিষেধ করতে পারলেননা। যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পর কাফেলাসহ আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। সে সময় আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী বসরা অনেক দিক দিয়ে সেরা ছিল। কথিত আছে, শহরটিতে জারজিস সামে এক খ্রিস্টান পাদ্রী ছিলেন যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গীর্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এ সময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফুজ্জারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন নবীর বয়স ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিলনা। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।

নবুয়তপূর্ব জীবনঃ আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা দমনের জন্যই হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ এতে যোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তরুণ বয়সে মুহাম্মাদের তেমন কোন পেশা ছিলনা। তবে তিনি বকরি চরাতেন বলে অনেকেই উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চরাতেন সেগুলো ছিল বনি সা’দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চরাতেন। এরপর তিনি ব্যবসায় শুরু করেন। মুহাম্মাদ অল্প সময়ের মধ্যেই একাজে ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। এতই খ্যাতি তিনি লাভ করেন যে তার উপাধি হয়ে যায় আল আমিন এবং আল সাদিক যেগুলোর বাংলা অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী। ব্যবসায় উপলক্ষ্যে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। মুহাম্মাদের সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকে নিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান। মুহাম্মাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান।

খাদীজা মাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংশা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপরে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে শুনে মুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তার অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন জানাবেন। মুহাম্মাদ তাঁর চাচাদের সাথে কথা বলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ আর মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫।

মুহাম্মাদের বয়স যখন ৩৫ বছর তখন কা’বা গৃহের পূনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি কারণে কাবা গৃহের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরনো ইমারত ভেঙে ফেলে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়। এভাবে পুনঃনির্মানের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ (পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোন গোত্রের লোক এই কাজটি করবে তা নিয়েই ছিল কোন্দল। নির্মাণকাজ সব গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবৎ এ বিবাদ অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি একটি সমাধান নির্ধারণ করে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। পরদিন মুহাম্মাদ সবার প্রথমে কাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আর তার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। যা হোক এই দায়িত্ব পেয়ে মুহাম্মাদ অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালা করেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিবদমান প্রত্যেক গোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকে চাদরের বিভিন্ন কোণা ধরে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেন এবং তারা তা ই করে। এরপর তিনি পাথর উঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।

নবুওয়ত প্রাপ্তিঃ চল্লিশ বছর বয়সে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ নবুওয়ত লাভ করেন, অর্থাৎ এই সময়েই স্রষ্টা তার কাছে ওহী প্রেরণ করেন। নবুওয়ত সম্বন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় আজ-জুহরির বর্ণনায়। জুহরি বর্ণিত হাদীস অনুসারে নবী সত্য দর্শনের মাধ্যমে ওহী লাভ করেন। ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর নবী প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। এমনি এক ধ্যানের সময় ফেরেশতা জিব্রাইল তার কাছে আল্লাহ প্রেরিত ওহী নিয়ে আসেন। জিব্রাইল তাঁকে এই পংক্তি কটি পড়তে বলেন:

পাঠ করুনআপনার পালনকর্তার নামেযিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেনমানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পাঠ করুনআপনার পালনকর্তা মহা দয়ালুযিনিকলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেনশিক্ষাদিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না 

উত্তরে নবী জানান যে তিনি পড়তে জানেন না, এতে জিব্রাইল তাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন এবং আবার একই পংক্তি পড়তে বলেন। কিন্তু এবারও মুহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মুহাম্মাদ পংক্তিটি পড়তে সমর্থ হন। অবর্তীর্ণ হয় কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ; সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। প্রথম অবতরণের পর নবী এতই ভীত হয়ে পড়েন যে কাঁপতে কাঁপতে নিজ গ্রহে প্রবেশ করেই খাদিজাকে কম্বল দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। বারবার বলতে থাবেন, “আমাকে আবৃত কর”।  নওফেল তাঁকে শেষ নবী হিসেবে আখ্যায়িত করে। ধীরে ধীরে আত্মস্থ হন নবী। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী প্রত্যাদেশের জন্য। একটি লম্বা বিরতির পর তাঁর কাছে দ্বিতীয় বারের মত ওহী আসে। এবার অবতীর্ণ হয় সূরা মুদ্দাস্‌সির-এর কয়েকটি আয়াত। এর পর থেকে গোপনে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন মুহাম্মাদ। এই ইসলাম ছিল জীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়ার জন্য প্রেরিত একটি আদর্শ ব্যবস্থা। তাই এর প্রতিষ্ঠার পথ ছিল খুবই বন্ধুর। এই প্রতিকূলততার মধ্যেই নবীর মক্কী জীবন শুরু হয়।

মক্কী জীবনঃ  গোপন প্রচার: প্রত্যাদেশ অবতরণের পর নবী বুঝতে পারেন যে, এটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে পুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে হবে; কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করা ব্যাতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোন উপায় ছিলনা। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝেগোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। মুহাম্মাদের আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন খাদিজা। এরপর মুসলিম হন মুহাম্মাদের চাচাতো ভাই এবং তার ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলী, ইসলাম গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য নবী নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণ করে, সে হলো আলী। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধূ আবু বকর। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।

প্রকাশ্য দাওয়াততিন বছর গোপনে দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। এ ধরণের প্রচারের সূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল। নবী সাফা পর্বতের ওপর দাড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল। কিন্তু এতে সকলে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায় এবং এই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অত্যাচার শুরু হয়।

মক্কায় বিরোধিতার সম্মুখীনবিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে নির্যাতন শুরু করে: প্রথমত উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি, এরপর অপপ্রচার, কুটতর্ক এবং যুক্তি। এক সময় ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার প্রচেষ্টা শুরু হয় যাকে সফল করার জন্য একটি নেতিবাচক ফ্রন্ট গড়ে উঠে। একই সাথে গড়ে তোলা হয় সাহিত্য ও অশ্লীল গান-বাজনার ফ্রন্ট, এমনকি একং পর্যায়ে মুহাম্মাদের সাথে আপোষেরও প্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ তা মেনে নেননি; কারণ আপোষের শর্ত ছিল নিজের মত ইসলাম পালন করা, সেক্ষেত্র তার ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই ভেস্তে যেতো।

 ইথিওপিয়ায় হিজরতধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবী কিছু সংখ্যক মুসলিমকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর কারণে তা সফল হয়নি।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণএরপর ইসলামের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। নবী সবসময় চাইতেন যেন আবু জেহেল ও উমরের মধ্যে যেকোন একজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। তার এই ইচ্ছা এতে পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরের বিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে খানিকটা সহজ করে, যদিও কঠিন অংশটিই তখনও মুখ্য বলে বিবিচেত হচ্ছিল। এরপর একসময় নবীর চাচা হামযা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়।

একঘরে অবস্থাএভাবে ইসলাম যখন শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছে তখন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারী সহ সহ গোটা বনু হাশেম গোত্রকে একঘরে ও আটক করে। তিন বছর আটক থাকার পর তারা মুক্তি পায়।

দুঃখের বছর  তায়েফ গমনকিন্তু মুক্তির পরের বছরটি ছিল মুহাম্মাদের জন্য দুঃখের বছর। কারণ এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যায়। দুঃখের সময়ে নবী মক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপরে অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান (অবশ্য তায়েফ গমনের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে)। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিছনে লেলিয়ে দেয়; তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে নবীকে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়েননি; নব নব সম্ভবনার কথা চিন্তা করতে থাকেন।           

মিরাজ তথা উর্দ্ধারোহনএমন সময়েই কিছু শুভ ঘটনা ঘটে। ইসলামী ভাষ্যমতে এ সময় মুহাম্মাদ এক রাতে মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায় যান; এই ভ্রমণ ইতিহাসে ইসরা নামে পরিচিত। কথিত আছে, মসজিদুল আকসা থেকে তিনি একটি বিশেষ যানে করে উর্দ্ধারোহণ করেন এবং মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেন, এছাড়া তিনি বেহেশ্‌ত ও দোযখ সহ মহাবিশ্বের সকল স্থান অবলোকন করেন। এই যাত্রা ইতিহাসে মি’রাজ নামে পরিচিত। এই সম্পূর্ণ যাত্রার সময়ে পৃথিবীতে কোন সময়ই অতিবাহিত হয়নি বলে বলা হয়।

মদীনায় হিজরতঃ এরপর আরও শুভ ঘটনা ঘটে। মদীনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মূলত হজ্জ্ব করতে এসে ইসলামে দাওয়াত পেয়েছিল। এরা আকাব নামক স্থানে মুহাম্মাদের কাছে শপথ করে যে তারা যে কোন অবস্থায় নবীকে রক্ষা করবে এবং ইসলামে প্রসারে কাজ করবে। এই শপথগুলো আকাবার শপথ নামে সুপরিচিত। এই শপথগুলোর মাধ্যমেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদীনার ১২ টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। মদীনা তথা ইয়াসরিবে অনেক আগে থেকে প্রায় ৬২০ সাল পর্যন্ত গোত্র গোত্র এবং ইহুদীদের সাথে অন্যদের যুদ্ধ লেগে থাকে। বিশেষত বুয়াছের যুদ্ধে সবগুলো গোত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ায় প্রচুর রক্তপাত ঘটে। এ থেকে মদীনার লোকেরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়ে রক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতে পারেনা। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যদিও আমন্ত্রণকারী অনেকেই তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সবশেষে মুহাম্মাদ ও আবু বকর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন। তাদের হিজরতের দিনেই কুরাইশরা মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি। এভাবেই মক্কী যুগের সমাপ্তি ঘটে।

 মাদানী জীবনঃ নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রের সাথে যোগদান আরবে অসম্ভব হিসেবে পরিগণিত হত। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেরকম নয়, কারণ এক্ষেত্রে ইসলামের বন্ধনই শ্রেষ্ঠ বন্ধন হিসেবে মুসলিমদের কাছে পরিগণিত হত। এটি তখনকার যুগে একটি বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম দেয়। ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকার বর্ষের শেষে AH উল্লেখিত থাকে যার অর্থ: After Hijra।

 স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা  সংবিধান প্রণয়নমুহাম্মাদ মদীনায় গিয়েছিলেন একজন মধ্যস্থতাকারী এবং শাসক হিসেবে। তখন বিবদমান দুটি মূল পক্ষ ছিল আওস ও খাযরাজ। তিনি তার দায়িত্ব সুচারুরুপে পালন করেছিলেন। মদীনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ স্বাক্ষর করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই সনদের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে সকল রক্তারক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতির গোড়াপত্তন করা হয় এবং সকল গোত্রের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভুতি সৃষ্টি করা হয়। আওস, খাযরাজ উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানত তিনটি ইহুদী গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু কুরাইজা এবং বনু নাদির)। এগুলোসহ মোট আটটি গোত্র এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদীনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)হন তার প্রধান।

মক্কার সাথে বিরোধ  যুদ্ধমদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার সাথে এর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে। মক্কার কুরাইশরা মদীনা রাষ্ট্রের ধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। মুহাম্মাদ(স)মদীনায় এসে আশেপাশের সকল গোত্রের সাথে সন্ধি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে অগ্রণী ছিলেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশরা গৃহত্যাগী সকল মুসলিমদের সম্পত্তি ক্রোক করে। এই অবস্থায় ৬২৪ সালে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)৩০০ সৈন্যের একটি সেনাদলকে মক্কার একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠায়। কারণ উক্ত কাফেলা বাণিজ্যের নাম করে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কুরাইশরা তাদের কাফেলা রক্ষায় সফল হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়। আত্মরক্ষামূলক এই যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্য সংখ্যার দিক দিয়ে কুরাইশদের এক তৃতীয়াংশ হয়েও বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত হয়। মুসলিমদের মতে এই যুদ্ধে আল্লাহ মুসলিমদের সহায়তা করেছিলেন। যাহোক, এই সময় থেকেই ইসলামের সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর ৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিতে হয়। এতে প্রথম দিকে মুসলিমরা পরাজিত হলেও শেষে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। কুরাইশরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তের নীতিগত দূর্বলতার কারণে পরাজিতের বেশে মক্কায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধ বিজয়ে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে আশেপাশের অনেক গোত্রের উপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।

মদীনার ইহুদিদের সাথে সম্পর্কঃ কিন্তু এ সময় মদীনার বসবাসকারী ইহুদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদীরা বিশ্বাস করতনা যে, একজন অ-ইহুদী শেষ নবী হতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শ মেনে নেয়নি এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি বুঝতে পারে তখন তারা এর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)প্রতিটি যুদ্ধের পরে একটি করে ইহুদী গোত্রের উপর আক্রমণ করেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনু কাইনুকা ও বনু নাদির গোত্র সপরিবারে মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়; আর খন্দকের পর সকল ইহুদীকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা হয়।মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এই ইহুদী বিদ্বেশের দুটি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটি ধর্মীয় এবং অন্যটি রাজনৈতিক। ধর্মীয় দিক দিয়ে চিন্তা করলে আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকে মেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করলে, ইহুদীরা মদীনার জন্য একটি হুমকী ও দুর্বল দিক ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।

 হুদাইবিয়ার সন্ধিঃ কুরআনে যদিও মুসলিমদের হজ্জ্বের নিয়ম ও আবশ্যকীয়তা উল্লেখ ককরা আছে, তথাপি কুরাইশদের শত্রুতার কারণে মুসলিমরা হজ্জ্ব আদায় করতে পারছিল না। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক দিব্যদর্শনে দেখতে পান তিনি হজ্জ্বের জন্য মাথা কামাচ্ছেন। এ দেখে তিনি হজ্জ্ব করার জন্য মনস্থির করেন এবং ৬ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবা নিয়ে মদীনার পথে যাত্রা করেন। কিন্তু এবারও কুরাইশরা বাঁধা দেয়। অগত্যা মুসলিমরা মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করে। এখানে কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে সুপরিচিত। এই সন্ধি মতে মুসলিমরা সে বছর হজ্জ্ব করা ছাড়াই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে। সন্ধির অধিকাংশ শর্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে গেলেও মুহাম্মাদ এই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন।

বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পত্র প্রেরণঃ রাসূল (সাঃ)সারা বিশ্বের রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং পৃথিবীর সব জায়গায় ইসলামের আহ্বান পৌঁছ দেয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলো থেকে আশ্বস্ত হয়ে এ কাজে মননিবেশ করেন। সেসময়ে পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলো ছিল ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য (the holy roman empire),এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশা সাম্রাজ্য। এছাড়াও মিশরের ‘আযীয মুকাউকিস’,ইয়ামামার সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিল। তাই ষষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের শেষদিকে একইদিনে এদেঁর কাছে ইসলামের আহ্বানপত্রসহ ছয়জন দূত প্রেরণ করেন।

প্রেরিত দূতগণের তালিকাঃ

দাহিয়া ক্বালবী (রাঃ)কে রোমসম্রাট কায়সারের কাছে।আবদুল্লাহ বিন হুযাফা (রাঃ)কে পারস্যসম্রাট পারভেজের কাছে।হাতিব বিন আবূ বুলতা’আ (রাঃ) কে মিশরৈর শাসনকর্তার কাছে।আমর বিন উমাইয়া (রাঃ) কে হাবশার রাজা নাজ্জাশীর কাছে।সলীত বিন উমর বিন আবদে শামস (রাঃ) কে ইয়ামামার সর্দারের কাছে।শুজাইবনে ওয়াহাব আসাদী (রাঃ)কে গাসসানী শাসক হারিসের কাছে।

শাসকদের মধ্য হতে শুধুমাত্র বাদশাহ নাজ্জাসী ছাড়া আর কেউ ইসলাম গ্রহণ করেননি।

মক্কা বিজয়ঃ দশ বছরমেয়াদি হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দু’ বছর পরেই ভেঙ্গে যায়। খুযাআহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র,অপরদিকে তাদের শত্রু বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বকর গোত্র খুযাআদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহয়োগিতা করে। কোন কোন বর্ণনামতে কুরাইশদের কিছু যুবকও এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ (সঃ) কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো;

কুরাইশ খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে।অথবা তারা বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে।অথবা এ ঘোষণা দিবে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করবে। কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশ তাদের ভুল বুঝতে পারলো এবং আবু সুফয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্য দূত হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করলো। কিন্তু মুহাম্মাদ (সঃ) কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করলেন।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ (সঃ) দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন।সেদিন ছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনাপ্রতিরোধে মক্কা বিজিত হলো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) বিজয়ীবেশে সেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজন নর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুহাম্মাদ (সঃ)এর কুৎসা রটাত। তবে এদের মধ্য হতেও পরবর্তিতে কয়েকজনকে ক্ষমা করা হয়। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ (সঃ) সর্বপ্রথম কাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবং মুহাম্মাদ (সঃ)এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই ইসলাম গ্রহণ করে। কোরআনে এই বিজয়ের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মৃত্যুঃ বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে মুহাম্মদ (সাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচন্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতা তীব্র হওয়ার পর তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রাঃ)এর কামরায় অবস্থান করতে থাকেন। তাঁর কাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল,মৃত্যুর একদিন পূর্বে তিনি এগুলোও দান করে দেন। বলা হয়, এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে ১১ হিজরী সালের রবিউল আউয়াল মাসের ১ তারিখ সন্ধায় তিনি মৃত্যবরণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। আলী (রাঃ) তাকেঁ গোসল দেন এবং কাফন পরান। আয়েশ (রাঃ)এর কামরার যে স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন,জানাযার পর সেখানেই তাকেঁ দাফন করা হয়।

 

 

-সময় সংবাদ বিডি অবলম্বনে