অনেকেই এক দিনের ছুটিতে ঘুরার জন্য প্লেন খুঁজে বেরায়, আর আমি নিয়ে এলাম একদিন ঘুরার দারুণ এক প্লেন। প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরতে আসে কুমিল্লায়। কুমিল্লাতে বহুসংখ্যক পর্যটন আকর্ষন রয়েছে। কুমিল্লার লালমাই ময়নামতি পাহাড়ে একটি সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে। এখানে রয়েছে শালবন বিহার, কুটিলা মুড়া, চন্দ্রমুড়া, রূপবন মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, সতের রত্নমুড়া, রাণীর বাংলার পাহাড়, আনন্দ বাজার প্রাসাদ, ভোজ রাজদের প্রাসাদ, চন্ডীমুড়া প্রভৃতি। এসব বিহার, মুড়া ও প্রাসাদ থেকে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে যা ময়নামতি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ময়নামতি একটি বিখ্যাত বৌদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। ময়নামতি জাদুঘরটি একটি অন্যতম পর্যটন আকর্ষন হিসেবে পরিচিত। কুমিল্লাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিহত বিভিন্ন দেশের সৈন্যদের কবর ও ওয়ার সেমেট্রি রয়েছে। বতর্মানে রাজেশ পুর ইকোপার্ক এবং তদসংলগ্ন বিরাহিম পুরের সীমান্তবর্তী শাল বন টুরিস্ট স্পট হিসেবে ব্যপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কুমিল্লা জেলার পর্যটন অঞ্চল/দর্শনীয় স্থান সমূহ :
প্রাকৃতিক শোভায় সুশোভিত কুমিল্লা জেলায় রয়েছে বহু দৃষ্টিনন্দন স্থান। এসব স্থান সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু বর্ণনা উপস্থাপন করা হল-
শালবন বৌদ্ধ বিহারঃ
শালবন বৌদ্ধ বিহার বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি এই বৌদ্ধ বিহার। এতে ৭ম-১২শ শতকের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় যে খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। শালবন বিহারের ছয়টি নির্মাণ ও পুনঃনির্মাণ পর্বের কথা জানা যায়। খৃষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে তৃতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় মন্দিরটি নির্মাণ করা হয় ও বিহারটির সার্বিক সংস্কার হয় বলে অনুমান করা হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয় নবম-দশম শতাব্দীতে। আকারে এটি চৌকো। শালবন বিহারের প্রতিটি বাহু ১৬৭.৭ মিটার দীর্ঘ। বিহারের চার দিকের দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু। কক্ষগুলো বিহারের চার দিকের বেষ্টনী দেয়াল পিঠ করে নির্মিত। বিহারে ঢোকা বা বের হওয়ার মাত্র একটাই পথ ছিল। এ পথ বা দরজাটি উত্তর ব্লকের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের মাঝে ১.৫ মিটার চওড়া দেয়াল রয়েছে। বিহার অঙ্গনের ঠিক মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় মন্দির। বিহারে সর্বমোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। কক্ষের সামনে ৮.৫ ফুট চওড়া টানা বারান্দা ও তার শেষ প্রান্তে রয়েছে অনুচ্চ দেয়াল। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গিতে দেবদেবী, তেলের প্রদীপ ইত্যাদি রাখা হতো। এই কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন। সেখানে বিদ্যাশিক্ষা ও ধর্মচর্চা করতেন। বিহারের বাইরে প্রবেশ দ্বারের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি হলঘর রয়েছে। চার দিকে দেয়াল ও সামনে চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর নির্মিত সে হলঘরটি ভিক্ষুদের খাবার ঘর ছিল বলে ধারণা করা হয়। হলঘরের মাপ ১০ মিটার গুণন ২০ মিটার। হলঘরের চার দিকে ইটের চওড়া রাস্তা রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রৌঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে । কিভাবে যাওয়া যায়: কুমিল্লা শহর হতে ট্যাক্সি যোগে যাওয়া যায়। কুমিল্লা সেনানিবাস বাসট্যান্ড হতে ট্যাক্সি, বাস, রিক্সা যোগে যাওয়া যায়।
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রিঃ
ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বাংলাদেশের কুমিল্লাতে অবস্থিত একটি কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মায় সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), আসাম, এবং বাংলাদেশে ৯টি রণ সমাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশে দুটি কমনওয়েলথ রণ সমাধিক্ষেত্র আছে, যার একটি কুমিল্লায় এবং অপরটি চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রতিবছর প্রচুর দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এ সমাধিক্ষেত্রে আসেন।
ময়নামতি রণ সমাধিক্ষেত্র মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯০৩-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও বৃটিশ সৈন্যদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৬ সালে তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছেই এই যুদ্ধ সমাধির অবস্থান। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাধিক্ষেত্রটিতে ৭৩৬টি কবর আছে। এর মধ্যে অধিকাংশ কবর হল সে সময়কার হাসপাতালের মৃত সৈনিকগণের। তাছাড়াও যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু লাশ স্থানান্তর করেও এখানে সমাহিত করা হয়। বাহিনী অনুযায়ী এখানে রয়েছেন ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক। সর্বমোট ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছিল। যুক্তরাজ্য ৩৫৭, কানাডা ১২, অস্ট্রেলিয়া ১২, নিউজিল্যান্ড ০৪, দক্ষিণ আফ্রিকা ০১, অবিভক্ত ভারত* ১৭৮, রোডেশিয়া ০৩, পূর্ব আফ্রিকা ৫৬, পশ্চিম আফ্রিকা ৮৬, বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ০১, বেলজিয়াম ০১, পোল্যান্ড ০১, জাপান ২৪। * "অবিভক্ত ভারত" বলতে বোঝানো হচ্ছে বর্তমানকার ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে নিয়ে যে বিশাল এলাকা। সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রে ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একখানা দেয়াল ফলক লাগানো রয়েছে। ভিতরে সরাসরি সামনে প্রশস্থ পথ, যার দুপাশে সারি সারি কবর ফলক। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যু তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়- খ্রিস্টানদের কবর ফলকে ক্রুশ, মুসলমানদের কবর ফলকে আরবি লেখা (যেমন: হুয়াল গাফুর) উল্লেখযোগ্য। প্রশস্থ পথ ধরে সোজা সম্মুখে রয়েছে সিঁড়ি দেয়া বেদি, তার উপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় পবিত্র প্রতীক ক্রুশ। বেদির দুপাশে রয়েছে আরো দুটি তোরণ ঘর। এসকল তোরণ ঘর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পিছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরো বহু কবর ফলক। প্রতি দুটি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ শোভা পাচ্ছে। এছাড়া পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে প্রচুর গাছ। সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশস্থ পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসাথে ২৩টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। কিভাবে যাওয়া যায়: কুমিল্লা শহর হতে বাস অথবা ট্যাক্সি যোগে যাওয়া যায়।
শাহ সুজা মসজিদঃ
শাহ সুজা মসজিদ ৩৫২ বছর ধরে কুমিল্লায় জেলায় স্ব মহিমায় টিকে আছে। এ মসজিদের নামকরণ, প্রতিষ্ঠাতার নাম ও প্রতিষ্ঠার তারিখ নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এ মসজিদ যে পাক ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন মসজিদ গুলোর মধ্যে অন্যতম সে বিষয়ে কারো সন্দেহ নেই। গোমতী নদীর কোল ঘেষে কুমিল্লা শহরের মোগলটুলীতে এ মসজিদ তৈরী করা হয়েছিল। অবশ্য বর্তমানে গোমতী নদীটি ১ কিঃমিঃ দূরত্বে প্রবাহমান। আয়তনের দিক দিয়ে এ মসজিদ খুব বেশী বড় না হলেও এর কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সার্বিক অবয়ব আভিজাত্যের প্রতীক বহন করে। এর বাহ্যিক কারুকাজ প্রমাণ করে তৎসময়ে এর প্রতিষ্ঠাতাদের স্রষ্টার প্রতি সুবিশাল আনুগত্য এবং রুচির পরিচায়ক। ঐতিহ্য আর আভিজাত্যের প্রতীক মোগলটুলী শাহ সুজা মসজিদের প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সন তারিখ উল্লেখ না থাকলেও জনশ্রুতি রয়েছে যে ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এ মসজিদ নির্মিত হয়েছে। কেন্দ্রীয় গম্বুজটি পাশের দুটি গম্বুজ থেকে আকারে বড়। সাম্প্রতিকালে মসজিদের দুই প্রান্তে ২২ ফুট করে দুটি কক্ষ এবং সম্মুখ ভাগে ২৪ ফুট প্রশস্ত একটি বারান্দা নির্মাণ করায় আদি রূপ কিছুটা নষ্ট হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি সুউচ্চ মিনারও নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের বর্তমানে কোন শিলালিপি নেই। শাহ সুজা যখন বাংলার সুবেদার তখন এ মসজিদ নির্মিত হতে পারে। কিন্তু তিনি নিজে এ মসজিদ নির্মাণ করেছেন বলে মনে হয় না। কারণ, শাহ সুজা কোন দিন ত্রিপুরা রাজ্য বিজয়ে এসেছিলেন বলে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। গোবিন্দ মানিক্যের তথাকথিত বন্ধু শাহ সুজা স্মৃতি রক্ষার্থে এ মসজিদ নিমার্ণ করেছিলেন, এই জনপ্রবাদ ভিত্তিহীন বলে মনে হয়। কারণ, ক্ষুদ্র হলেও একটি স্বাধীন রাজ্যের নৃপতি ছিলেন গোবিন্দ মানিক্য। তিনি বন্ধুর শেষ স্মৃতি চিহ্ন বিক্রি করে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেবেন, তা আদৌ সম্ভব বলে মনে হয় না। খুব সম্ভব কুমিল্লা শহর অঞ্চলে অবস্থিত মোঘল ঘাঁটির মুসলমান অধিবাসীদের নামাজ পড়ার সুবিধার জন্য তৎকালীন কুমিল্লার মোঘল ফৌজদার এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন এবং সুবেদার শাহ সুজার নাম এটিকে নামাঙ্কিত করেছিলেন। আজ থেকে সাড়ে তিনশ বছর পূর্বে নির্মিত এই মসজিদটি উত্তর দক্ষিণে লম্বা। মসজিদের চার কোনে ৪টি অষ্ট কোনাকার মিনার ছিল।এগুলি মসজিদের ছাদের অনেক উপরে উঠে গেছে। সামনের দেয়ালে ছিল ৩টি দরজা এবং ভেতরে পশ্চিম দেওয়ালে ছিল ৩টি মেহরাব। কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথ ও মেহরাব অন্য দুটির চেয়ে অনেক বড়।কেন্দ্রীয় দরজাটির বাইরের দিকে কিছুটা প্রসারিত এবং দুপাশে আছে দুটি সরু গোলাকার মিনার। মসজিদের সম্মুখ ভাগে প্যানেল দ্বারা সুশোভিত ছিল এবং কার্নিশের উপরে ছিল ব্যাটলম্যান্ট, তার ওপরে ছিল একটি গম্বুজ। কুমিল্লা নগরীতে সুজা মসজিদটি অবস্থিত। এই মসজিদ সম্পর্কে দুই প্রকার জনশ্রুতি রয়েছে: প্রথমত: সুজা ত্রিপুরা জয় করে বিজয় বৃত্তান্ত চিরস্মরণীয় করার জন্য এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, মহারাজ গোবিন্দ মানিক্য সুজার নামে চিরস্মরণীয় করার জন্য নিমচা তরবারী ও হিরকাঙ্গুরীয়ের বিনিময়ে বহু অর্থ ব্যয় করে এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয় প্রবাদ অপেক্ষা প্রথমোক্ত প্রবাদ সত্য বলে ধারণা করা হয়। জনৈক প্রাচীন মুসলমানের নিকট এরূপ শ্রুত হয়েছে যে, অর্ধশতাব্দি কিংবা ততোধিক কাল পূর্বে জনৈক ত্রিপুরা রাজা সরকারী দেওয়ান ওয়াক্ফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য এর গায়ে সংযুক্ত ফলকটি উঠিয়ে গোমতী নদীতে ফেলে দিয়েছিলেন। কুমিল্লার অন্তগর্ত সুজানগর নামক পল্লী সেই মসজিদের ওয়াকফ বলে জানা যায়। শ্রুতি যাই থাকুক না কেন কুমিল্লার গোমতীর তীরের শাহ সুজা মসজিদটি পাক ভারত উপ মহাদেশের প্রাচীন সভ্যতার অপূর্ব নিদর্শন। কিভাবে যাওয়া যায়: রিক্সা অথবা ট্যাক্সি যোগে যাওয়া যায়।
উটখাড়া মাজারঃ
ফকির- দরবেশ- আউলিয়ার দেশ বাংলাদেশ। বার আউলিয়া চট্রগ্রামে, তিনশত ষাট আউলিয়া সিলেটে আর তিনশত আউলিয়ার বিচরণ ভূমি কুমিল্লা। এসম্পর্কে বিশিষ্ট লেখক মোঃ আব্দুল কুদ্দুস লিখেছেন- "লাকসামেতে শাহ শরীফ কুমিল্লায় আব্দুল্লহ ঘুমিয়ে আছে জেলার মাঝে তিনশ' আউলিয়া।" ইসলামী গবেষক ও চিন্তাবিদদের মতে কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার ইসলাম ধর্ম প্রচারে হজরত শাহ কামাল (রঃ) ও হজরত শাহ জামাল (রঃ)'র অবদান স্মরণীয়। তবে এক্ষেত্রে দেবিদ্বার ইসলাম ধর্ম প্রচারে কে সর্বপ্রথম এসেছিলেন তার কোন সঠিক দিক নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। তবে কেউ কেউ মনে করেন ৬৭০ হিজরি ও ১২৭১ খ্রীস্টাব্দে ইয়েমেনে জন্ম গ্রহণকারী কোরেশ বংশোদ্ভুত বিশিষ্ট অলী শায়খ মাহামুদ (রঃ)'র পুত্র হজরত শাহজালাল (রঃ) ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে ইয়েমেন থেকে ১২জন সফর সঙ্গী নিয়ে ভারতবর্ষের দিকে রওয়ানা হয়ে ১৩০০ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীতে আসেন। দিল্লী থেকে ১৩১৫ খ্রীস্টাব্দে বাংলাদেশের সিলেটে (শ্রীহট্ট) আসা পর্যন্ত তার সফর সঙ্গী হন ৩৫৯ জন, এবং তিনিসহ ৩৬০জন। কারো কারো মতে ৩১৩ জন আউলিয়া ছিলেন। উনার জন্ম ৬৭০ হিজরী ও ১২৭১ খ্রীস্টাব্দে এবং ৭৬ বছর জীবদ্দশার পর অর্থাৎ ৭৪৬ হিজরী ও ১৩৪৭ খৃষ্টাব্দে তিনি সিলেটেই ইন্তেকাল করেন। সিলেট অঞ্চলে ৩২ বছর স্থায়ীভাবে বসবাস ও ইসলাম ধর্ম প্রচার করেন। ইসলাম ধর্ম প্রচারে তার শিষ্যদের ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রেরণ করেন। হজরত শাহজালাল (রঃ)'র আগমণেরও প্রায় দু'শত বছর পূর্বে অর্থাৎ ১১১২ সালে ইয়েমেন থেকে আসা শাহ্ মোহাম্মদ আব্বাস হুসাইনী নামক একজন দরবেশ কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার রাজামেহার গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর বংশধরগণ এখনো বংশ পরষ্পরায় এখানে বসবাস করছেন। হজরত শাহজালাল (রঃ)'র আগমন, তার সাথে আসা ৩৫৯ আউলিয়া এবং পরিবর্তিতে শিষ্যত্ব গ্রহণকারী আউলিয়াদের অবস্থান, পরিচিতি, সময়কাল ও মাজার নিয়ে ইসলামি গবেষক ও চিন্তাবিদ-দের মধ্যে বিতর্ক ও অনেক মতানৈক্য রয়েছে। তাছাড়া এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারে আসা ৩৬০ আউলিয়ার পরবর্তী ধাপে আসা অনেকে বুজুর্গ আউলিয়াই হজরত শাহজালাল (রঃ)'র শিষ্যত্ব গ্রহণপূর্বক তাদের কেরামতি, সুনাম-সুখ্যাতি নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শায়িত আছেন। হজরত শাহজালাল (রঃ)'র দ্বিতীয় পর্যায়ে শিষ্যত্ব গ্রহণকারী (৩৫৯ আউলিয়ার পরে) দেবিদ্বার এলাহাবাদের উটখাড়া'র শাহ্ কামাল (রঃ)'র কথা জানা যায়। দেবিদ্বারে এদের আগমন কত হিজরী বা সনে ঘটেছে তার কোন সঠিক তারিখ পাওয়া যায়নি। অনুমান করা হচ্ছে ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষ দিকে হজরত শাহজালাল (রঃ)'র শিষ্য ও প্রধান সিপাহ সালার হজরত নাছিরউদ্দিন শাহ্ (রঃ)'র সাথে শ্রীহট্টের (সিলেট'র) অত্যাচারী রাজা গৌড়গোবিন্দ রায় এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালিত হয়, ওই যুদ্ধে গৌড়গোবিন্দ পরাজিত হন। ওই সময় সম্ভবতঃ ত্রয়োদশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের প্রথম দিকে হজরত শাহজালাল (রঃ)এর শিষ্যদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তার দুই শিষ্য হজরত শাহ্ কামাল (রঃ), হজরত শাহ্ ইসরাঈল (রঃ)কে ইসলাম ধর্ম প্রচারে অন্যত্র যাওয়ার নির্দেশ দেন। কোথায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করবেন, তার কোন নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ না করে দিলেও তাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, তাদের এই বাহন উটই তাদের দ্বীন প্রচার কেন্দ্র নির্দিষ্ট করে দেবে, তাদের বহনকারী বাহন উট যেখানে গিয়ে থেমে যাবে বা উটের পা বালি কিংবা মাটিতে গেড়ে যাবে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন ও ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করবে। কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে এসে বালিতে উটের পা গেড়ে গিয়ে উট থেমে গেলে তারা এখানেই বসতি স্থাপন ও ইসলাম ধর্মপ্রচার শুরু করেন। বর্তমানে এলাহাবাদ গ্রামের ওই জায়গাটি উটখাড়া (গ্রামের পরিচয়ে) মাজার নামে পরিচিত এবং এ অঞ্চলে আল্লাহ্'র 'আবাদ' প্রচার ও প্রসার শুরু করায় উটখাড়াসহ বিশাল এলাকা আল্লহর আবাদ থেকে কালক্রমে 'এলাহাবাদ' নামে পরিচিতি লাভ করে। উটখাড়া মাজারটি কুমিল্লা জেলা সদর থেকে কুমিল্লা-সিলেট মহা সড়ক হয়ে প্রায় ২৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং দেবিদ্বার সদর থেকে পূর্ব-দক্ষিণে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কারো কারো মতে হজরত শাহ্ কামাল (রঃ)'র সাথে হজরত শাহ্ জামাল (রঃ) এখানে (এলাহাবাদ গ্রামের উটখাড়া) থেকে যান এবং হজরত শাহ্ কামাল(রঃ)'র অপর দু'সফর সঙ্গী হজরত শাহ্ ইসরাইল (রঃ) ও হজরত শাহ্ মোহাম্মদ নুরুদ্দিন (রঃ) পাশ্ববর্তী বুড়িচং উপজেলার ভারেল্লা গ্রামে চলে যান। হজরত শাহ্ জামাল (রঃ) হজরত শাহ্ কামাল (রঃ) সম্পর্কে সহোদর বলেও জানা যায়। আর শাহ্ ইসরাঈল (রঃ) এবং শাহ্ নুরুদ্দিন (রঃ) সম্পর্কে মামা ভাগ্নে। শাহ্ ইসরাঈল (রঃ)'র ভাগ্নে ছিলেন শাহ্ নুরুদ্দিন (রঃ)। উল্লেখ্য শাহ্ ইসরাঈল(রঃ) ও শাহ্ নুরুদ্দিন (রঃ)'র মাজার কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের বুড়িচং উপজেলার কংশনগর বাসস্ট্যান্ড হতে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে ভারেল্লা গ্রামে অবস্থিত। মৌলানা ছৈয়দ শাহ্ শেরআলী (রঃ)'র লিখা 'ছহি জোয়াহেরে মারফত ও শেরগঞ্জ' গ্রন্থে ত্রিপুরা(বর্তমান কুমিল্লা)'র পাইটকারা ভারেল্লা গ্রামের দু'আউলিয়া হজরত শাহ্ কামাল (রঃ) হজরত শাহ্ ইসরাঈল (রঃ); হজরত শাজালাল (রঃ)'র সাথে আসা ৩৫৯ আউলিয়ার সাথী ছিলেন না। তারা (হজরত শাহ্ কামাল (রঃ), শাহ্ ইসরাঈল (রঃ) ও হজরত শাহ্ নুরুদ্দিন (রঃ)) হজরত শাজালাল (রঃ)'র পরবর্তী দ্বিতীয় পর্যায়ে শিষ্যত্ব গ্রহনপূর্বক তারই নির্দেশে এদেশে এসে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। খান বাহাদুর আফজালুর রহমান স্টেট-এর আওতায় হজরত শাহ্ ঈসরাফিল (রঃ) উটখারা ওয়াকফ ষ্ট্যাট'র নামে নিজস্ব সম্পত্তি ছিল প্রায় একশত এগার একর। কালক্রমে ওই জায়গা বেদখল হয়ে বর্তমানে প্রায় তেইশ একর বার শতক জমি থাকলেও মাজারের নামে ওয়াক্ফ করা হয়েছে আরো কম। মাত্র দশ একর সাতাশি শতক। ওয়াক্ফকৃত জায়গায় মাজারের অংশ তেইশ শতক ছাড়া বাকী প্রায় দশ একর চৌষট্টি শতক সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। ওই জায়গায় একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি সমাজ কল্যাণ অফিস ও একটি দিঘি ও একাধিক ছোট পুকুর রয়েছে। মাজারে ৪১টি কবর আছে। তবে বংশানুক্রমে হজরত শাহ কামাল (রঃ) ও হজরত শাহ জামাল (রঃ) এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিভাবে যাওয়া যায়: দেবিদ্বার শহর হতে রিকসা অথবা ট্যাক্সিযোগে যাওয়া যায়।
প্রাচীন আলোয় কুমিল্লাঃ
জনপদের নাম কুমিল্লা। গোমতী পাড়ের শহর। ত্রিপুরার রাজারা এক সময় এ শহরের গোড়াপত্তন করেছিল গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপন কেন্দ্র হিসেবে। গোমতী পাড় বলে এ জনপদের সুখ্যাতি রয়েছে। ব্যাংক ও ট্যাংকের (পুকুর) শহর কুমিল্লা। তার পাশঘেঁষে গড়ে উঠেছে কমলাংক বা বর্তমান নাম কুমিল্লা। দক্ষিন এশিয়ার স্বপ্ন আয়তনের একটি দেশ হলেও পর্যটন শিল্পের বিচিত্রশাখায় সমৃদ্ধ এ জেলা। বিরল সৌন্দর্য এবং সভ্যতার আদি নিদর্শন এ অঞ্চলের মানুষের বর্ণাঢ্য জীবনধারা প্রকৃতির এ রূপ দেশী-বিদেশী ভ্রমন বিলাসীদের চিরকাল আকর্ষন করেছে। কুমিল্লা শহরের বুকজুড়ে রয়েছে আদি নিদর্শন বিহার, শালবন রুপবানমুড়া, ইটাখোলামুড়া, ময়নামতি ঢিবি, রানীর বাংলো, ময়নামতি জাদুঘর আরও আছে অপূর্ব প্রাকৃতিক ঘেরা সবুজ বৃক্ষবেষ্টিত লালমাটির লালমাই পাহাড়। প্রাচীন সভ্যতার নীরব সাক্ষী ময়নামতি লালমাই : কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কি.মি. পশ্চিমে অবস্থিত। টিলাগুলোর উত্তর অংশে ময়নামতি দক্ষিনে লালমাই। মাটির রঙ লাল ও টিলাগুলো ঢালু। ১৮৭৫ সালের আগ পর্যন্ত সব ছিল অজানা। বর্তমান কোটবাড়ি এলাকার রাস্তা তৈরির সময় ছোট ইমারতের ধ্বংসাবশেষে উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ভূমির ওপর অসংখ্য কাঠের ফসিলের টুকরো দেখতে পাওয়া যায় যা র্ভূমগুলীয় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ১৯১৭ সালে অধ্যক্ষ নলিনী কান্ত ভট্টশালী রনবংকমল¬ হরিকেল দেবের তাম্রশাসন (খ্রিস্টীয় তের শতক) উল্লেখিত দুর্গ বিহার পরিবেষ্টিত পট্টিকরা নগর বলে শনাক্ত করেন। প্রত্মতাত্ত্বিক খননের ও জরিপের ফলে মূল্যবান স্থাপত্যিক নিদর্শন আবিস্কৃত হয়। শালবন বিহার : কালিবাজার সড়ক ধরে কুমিল্লা শহর থেকে কোট বাড়ি এসে দক্ষিন দিকগামী রাস্তা দিয়ে ১.৫ কিলোমিটার এগিয়ে গেলে শালমানপুর গ্রামে পৌঁছার পর হাতের বামে শ্রী ভবদেব মহাবিহার। কালের পরিক্রমায় গ্রামের নামানুসারে শালবন বিহার নামকরন হয়। তবে সংক্ষিপ্ত পরিচয়ে যেটা পাওয়া যায় ১৯৫৫-৬৮ সাল পর্যন্ত খনন কাজ পরিচালনার ফলে ছয়টি বসতি আমরে চিহ্নসহ একটি বর্গাকার বিহারের ভেতর প্রবেশের জন্য উত্তরবাহুর মাঝখানে একটি তোরন আছে। বিহারের প্রথম বসতি আমল খরগও রাত। খোলা চত্বরের মাঝখানে বিহারের তোরনের সিঁড়ি থেকে দক্ষিনে কেন্দ্রীয় মন্দিরের অবস্থান। মন্দিরটি ক্রুসাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত। এই মন্দির পরিকল্পনাকে ইন্দোনেশিয়ায় জাভায় অবস্থিত কলসন মন্দির (৭৭৮ খ্রি.) মায়ানমার প্যাগানের আনন্দ মন্দির (১০৯০ খ্রি.) এবং বাংলাদেশের সোমপুর বিহার, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের স্থাপত্যর কলার উৎস সূত্র হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রদক্ষিণ পথের সঙ্গে খামওয়ালা হল ঘর সিঁড়ি গলিপথ ভজনালয় এবং ভজনালয় কোটাটিতে কুলিঙ্গসহ আসনের সংস্থান আজ ও অক্ষত রয়েছে। হলঘরের দক্ষিনে মূর্তি কোটার অবস্থান এবং রাখার জন্য বেদিও ছিল। চারপাশে রয়েছে প্রদক্ষিন পথ। কালের পরিক্রমায় মন্দিরের পরিসর কমে আসে। উল্লেখ্য, প্রত্যেক আমলে মন্দিরে ঢোকার জন্য উত্তর দিক থেকে সিঁড়ি ব্যবস্থা এবং চারপাশে ঘেরার উপযোগী পথের অস্তিত্ব ছিল বলে অনুমান করা যায়। বার্ড : এখানে ঘুরতে আসা অনেক পর্যটকই বার্ড প্রতিষ্ঠানটির নাম শুনলে ভাবেন এখানে অনেক অনেক পাখি থাকবে। যেমন নাম তেমনটা হওয়া উচিত। এর আশা দুইই। ছায়া সুনিবিড়ি মমতা ঘেরা রাস্তা। দু’পাশে নানা রকমের নানা রংয়ের ফুল ও ফলের বাগান। পাখির কূজন আর ফুলের গন্ধে চারদিক ঘিরে রেখেছে বার্ডকে। কিস্তর সবুজের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে কৃষ্ণচূড়া আর রঙ্গন। এ অপরূপভার গড়ে তোলেন ড. আখতার হামিদ খান। বার্ড মূলত বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষের প্রশিক্ষন একাডেমি। ওয়ার সিমেন্টি : ১৯৪১-৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ৭৩৭ জন সৈনিকের সমাধি ক্ষেত্র ময়নামতি। সবুজ বনানী আর ফলে ফুলে ভরা বাগানও বিশালকার স্তম্ভ। আশ্চর্য এবং লক্ষ্যনীয় বিষয় এই যে, বেশির ভাগ সৈনিকের বয়স ছিল ২০ থেকে ২২ বছর। জীবনের শুরুটা যখন ঠিক তখনই যুদ্ধে মহীয়ান তারা বীর সৈনিক। দেখা যাবে শহরের শুরুতেই খাবার পথে রাস্তার বাম দিকে। ময়নামতি জাদুঘর : বাংলাদেশে বেশ কয়টি জাদুঘর আছে তার মধ্যে ময়নামতি উল্লেখযোগ্য। এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে (খ্রি : অষ্টম শতাব্দীর) শ্রী ভবদেব মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চাপত্র মুড়া, রুপবান মুড়া, ইটাখোলামুড়া আনন্দবিহার, রানীর বাংলো ও ভোজ রাঙার বাড়ি ইত্যাদি থেকে উদ্ধারকৃত মূল্যবান পুরাবস্ত। জাদুঘরটি আকারে নির্মিত এবং পাশে বিশ্রাগার আছে ও ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা সবুজে সবুজে। ইটখোলা মড়া : উত্তর পশ্চিম কালিবাজার সড়কের সংলগ্ন উত্তর কোটবাড়ি এলাকায় অবস্থিত। পাশাপাশি দুটি প্রাচীন প্রত্নস্থাপনার ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এগুলো একটি মন্দির ও অপরটি বিহার। আবিস্কৃৃত পুরাবস্তুগুলোর মধ্যে চুনবালিজাত উপকরনে তৈরি একটি বড় আকারে লোকত্তর বৃদ্ধ (আবক্ষ অংশ ব্যতীত) আজও বিদ্যমান। রূপবানমুড়া ইটাখোলা মুড়ার দক্ষিনে কালিবাজার সড়কের ওপারেও রুপবান মুড়া। টিলাটি সড়ক পথ থেকে ১১. মি উঁচুতে। তিনটি বসতি আমলের অস্তিত্ব রয়েছে এই শৈলিতে। রুপবান মুড়া ক্রুসাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত। পেছনের অংশটি মূর্তিকোঠা এবং সামনেরটি মণ্ডপ। মূর্তির চারদিকে ঘোরানো পথ আছে। প্রত্মমানের বিচারে মন্দির ও বিহারটি খ্রি. অষ্টম শতাব্দীর নির্মিত যা আজও কালের সাক্ষী। ধর্ম সাগর : ত্রিপুরা রাজ্যের অধিপতি মহারাজ ধর্মানিক্য ১৪৫৮ সালে জনগনের পানি ও জলের সুবিধার জন্য এ দীঘি খনন করেন। দীঘির একপাশে তাম্রলিপি পাঠ আছে ফলকে। বিশ্রামের জন্য রয়েছে বেদি যা অবকাশ নামে পরিচিত। দীঘিটির বাম পাস ঘেঁষে রয়েছে ড. আখতার হামিদ খানের বাংলো যা রানীকুঠির নামে পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে যার অবদানে বাংলা আজ বাংলা নামে পরিচয় এমন কৃতী সন্তান ধীরেন্দ্র নাথ দত্তের বাড়ি, বিপ্লবী অতীন্দ্র মোহন সেনের বাড়ি এবং রয়েছে নজরুল ইসলামের কুমিল্লা জীবনের অনেক স্বাক্ষর। বলা যায় শিক্ষা শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির পাদপীঠে কুমিল্লা প্রাচীন ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হিসেবে এ উপমহাদেশে সুপরিচিত। এছাড়াও রয়েছে তার ব্যাংক ট্রাংক রোড নাম, খাদিশিল্প, তাঁত কুঠির, মৃত কারুশিল্প, রসনার তৃপ্তির জন্য রসমালাই আর রয়েছে ভাললাগার শীতলপাটি যা আজও আপন আলোয় শহরটিকে সমৃদ্ধ করেছে। কুমিল্লায় বিভিন্ন স্থানে যেতে যেতে অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্যের মুখোমুখি হবেন আপনি। এভাবে কেটে যাবে অনেকটা সময়। অবসর যাপনের এমন চমৎকার জনপদ পাওয়া দুষ্কর। যেভাবে যাবেন ঢাকা সায়েদাবাদ থেকে একাধিক বাস ছেড়ে যায় কুমিল্লার স্টেশন শাসনগাছার উদ্দেশ্যে। ভাড়া ২০০-২৩০। তারপর সেখান থেকে আপনি সহজেই যেতে পারবেন এই সব দেখতে। কুমিল্লার জাহাপুর জমিদার বাড়ি হাতিশালায় হাতি নেই, আস্তাবলে ঘোড়া নেই, সিংহ দরজায় সিংহ নেই দালানগুলোই শুধু স্মৃতি বহন করছে ৪০০ বছর আগের এ জমিদার বাড়িটির। কুমিল্লার মুরাদনগরের জাহাপুরে এর অবস্থান। গোমতি বিধৌত এ জাহাপুর। গোমতির কল কল ঢেউয়ের তালে তালে এক সময় বয়ে চলত জমিদারদের ‘গয়না’ নৌকা। তাদের ব্যাপারে বাংলার বার ভূঁইয়ার এক ভূইয়া কেঁদার রায় নাকি বলেছিলেন, মেঘনার পূর্ব পাড়ে কোন বড় জমিদার নেই। শাকের মধ্যে লবণতুল্য আছে জাহাপুরের জমিদাররা। কি কি দেখবেন জমিদার বাড়িতে পৌঁছেই দেখবেন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুটি সিংহ। তারা আপনাকে এ বাড়িতে নিঃশব্দে স্বাগত জানাবে। প্রধান ফটকে সবসময় দু’জন রক্ষী থাকত। জমিদারি আমলে এলে পরিচয় দিয়ে ঢুকতে হতো। এখন আর সেদিন নেই। রাইফেল অথবা তীর-ধনুক হাতে মাথায় পাগড়ি নিয়ে কোন শিখকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন না। বহিরাঙ্গন এবং অন্দরমহল তারাই দেখতেন। আপনাকে মূল গেটে দেখে হয়তো কেউ এগিয়ে আসবেন। তিনি আপনাকে মূল বাড়িতে নিয়ে যাবেন। প্রথম বিল্ডিংটি তিন তলা। পুরোটাই ইট-সুরকি দিয়ে নির্মিত। এরকম আরও ৯টি বিল্ডিং ছিল। ২টি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু জড়াজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাকিগুলো ভালো। ১মটি বাদে বাকি সবগুলো দোতলা। প্রধান গেট দিয়ে প্রবেশ করেই একটি মন্দির দেখতে পাবেন। এটি নাট মন্দির। দুর্গা পূজার সময় এখানে ভক্তরা সমবেত হন। পাশেই রয়েছে দুর্গাদেবীর প্রতিমা। প্রতিমাটি স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এখান থেকে সোজা চলে যাবেন অন্দর মহলে। এ মহলেই বর্তমান বংশধররা বসবাস করছে। এখানে দেখা হবে ১১তম বংশধর শ্রী আশীষ কুমার রায়, সমরেন্দ্র রায় ও অজিত কুমার রায়ের সঙ্গে। এছাড়া রয়েছেন প্রফেসর অঞ্জন কুমার রায়, অধ্যক্ষ রঞ্জন কুমার রায় ও তাদের পরিবারবর্গ। তারাই বর্তমানে এ বিশাল বাড়িটি দেখাশোনা করছেন। জমিদারদের আরও ২টি পরিবার এখানে বসবাস করছে। তবে ওই পরিবারগুলোর অধিকাংশ সদস্যই জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করছেন। তাই তাদের কারও সঙ্গে আপনার দেখা নাও হতে পারে। আপনার চোখের সামনের ভবনটির দরজার ওপরে খোদাই করা লেখা ‘১৩৩৪ বঙ্গাব্দ’ দেখবেন। এটি তৈরি করেছন অঞ্জন কুমার রায়ের দাদা অশ্বিনী কুমার রায়। এটি জমিদার বাড়ির সর্বশেষ ভবন। এর সামনে প্রশস্ত বারান্দা রয়েছে। ফ্লোর থেকে ছাদের উচ্চতা ১৪ ফুট। ছাদের নিচের অংশে কাঠের এবং লোহার তৈরি কারুকার্যময় সিলিং দেখতে পাবেন। দোতলায় ওঠার জন্য সরু সিঁড়ি দেখতে পাবেন। একটু ওঠে মাঝখানে দাঁড়াবেন। দোতলায় ৮ থেকে ১০টি কক্ষ। ইচ্ছে করলে ছাদ থেকে প্রায় ৩ একর আয়তনবিশিষ্ট পুরো জমিদার বাড়িটি দেখতে পারেন। ১৮৬২ সালে এ বংশের লোকরা জমিদারি লাভ করেন। জমিদারি শুরু করেন গৌরি মোহন। তার ভাই রাম দয়াল ও কমলা কান্ত তাকে সহযোগিতা করেন। তাদের অওতাধীন বর্তমান তিতাস, মুরাদনগর, দাউদকান্দি, চান্দিনা, দেবিদ্বার ও নবীনগর বিস্তৃত ছিল। নাস্তা শেষে আবার বাড়িতে প্রবেশ করুন। বাড়ির বাইরের অংশের একটি ঘরে উঁচু রথ দেখতে পাবেন। লোকজনের মুখে জানবেন, জমিদার অশ্বিনী কুমার রায় ১৩২৪ বঙ্গাব্দে জগন্নাথ দেবের রথ ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। আপনি যদি রথ যাত্রার সময় যান তাহলে দেখবেন হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হয়। বাড়ির বাইরের অংশে সুউচ্চ দেয়াল দেখবেন। একদিকে কাঁটা তারের বেড়া রয়েছে। একে একে সবগুলো ভবন ঘুরে দেখুন। দেখবেন কোনটা আই টাইপ, কোনটা এল টাইপে নির্মিত। সবগুলো ভবনেই সুশোভিত নকশা রয়েছে। সবগুলোতে ফুলের নকশা করা হলেও একই ধরনের ফুল ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি জানালার গ্রিলগুলোতেও নকশা করা রয়েছে। এ ধরনের নকশা আজকাল আর দেখা যায় না। জমিদার বাড়ির লোকদের কাছে জানবেন, বাড়িগুলোর নকশা তৈরিতে ঢাকার বিক্রমপুরের মিস্ত্রিরা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এগুলো মুঘল রীতিতে তৈরি। এবার প্রবেশ করুন রানী মহলে। সেখানে গিয়ে রানী নন্দ রানী, মহামায়া রায়, ও শ্যামা সুন্দরী দেবীর স্মৃতি মনে পড়বে। রানী মহলের সামনে একটি পুকুর ছিল। ওই পুকুরের পানিতে জাফরান মিশিয়ে রানীরা গোসল করতেন। এছাড়া হস্তচালিত পাম্পের মাধ্যমে ৩ তলায় পানি উঠিয়ে রানীরা গৃহকর্ম সম্পাদন করতেন। এবার চলে আসুন বেডরুমে। জমিদারদের ব্যবহƒত শৌখিন খাট, নকশা করা চেয়ার, গা এলিয়ে দেয়া ইজি চেয়ার, কারুকার্যখচিত ফুলদানি সবকিছুই দেখতে পাবেন। কাউকে জিজ্ঞেস করলে জানবেন, সেগুন কাঠের তৈরি নকশা করা আসবাবপত্রগুলো শতাধিক বছরের পুরনো। এবার আয়নামহলের দিকে এগিয়ে যান। এখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাচ-গানের আসর বসত। ওই সময় ব্যবহƒত দু-একটি হ্যাজাক লাইট দেখতে পাবেন। শৌখিন জমিদাররা জারবাতি ব্যবহার করতেন। তবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলোতে মোমবাতি ব্যবহার করা হতো। তখন কোন বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় হাতে টানা পাখা ব্যবহার করা হতো। এমন পাখা রঞ্জন বাবুর কাছে সন্ধান করলে দেখতে পাবেন। জমিদার গিরিশ চন্দ্র রায়ের পুত্র হেম চন্দ্র রায় সংস্কৃতিবান ছিলেন। তার আমলে জলসা ঘরে বড় ধরনের সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান হতো। বসতঘরের সামনে একটি ছোট্ট বাগান দেখতে পাবেন। এ বাগানে এক সময় শোভা পেত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আনা রঙ-বেরঙের ফুল গাছ। উড়িষ্যা থেকে আনা গোলাচি গাছটি দীর্ঘ দিন জীবিত ছিল। এখনও আছে নয়নাভিরাম পারিজাত, চাপা, ম্যাগনেশিয়াম ও কনকচাঁপা। এছাড়া পৃথক ফলবাগানও ছিল। এবার আপনি চলুন ডাইনিং পে¬সে। এখানে নিয়মিত কয়েকজন পাকা রাঁধুনি থাকত। জমিদার পরিবারের সদস্য ছাড়াও খাওয়া-দাওয়া করত পাইক-পেয়াদা ও খাজনা আদায়ে নিয়োজিত কর্মচারীরা। জমিদারদের ব্যবহƒত শ্বেত পাথরের একটি পে¬ট দেখে নিজের চোখকে ধন্য করতে পারেন। ভাত খাওয়ার পর ফল খাওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের অভ্যাস। তখনকার যুগে হাটবাজার কিংবা গলির মোড়ে আপেল-আঙ্গুর পাওয়া যেত না। নিজস্ব গয়না নৌকা দিয়ে চাঁদপুর গিয়ে সেখান থেকে স্টিমারে কলকাতা গিয়ে আপেল, আঙ্গুর নিয়ে আসা হতো। ডাইনিং পে¬সের চারদিকে চোখ রাখুন, দুর্লভ অনেক কিছু চোখে পড়বে। বর্তমানে আমরা পানি বিশুদ্ধ করার জন্য ফিল্টার ব্যবহার করি। আজ থেকে ১শ’ বছর আগেও জমিদাররা যে কতটা স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন তা দরজার পাশে রাখা ফিল্টারটির দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন। ফিল্টারটির নিচের অংশে চোখ নিলে দেখতে পাবেন ছোট্ট করে লেখা রয়েছে, ‘মেইড ইন লন্ডন’। এবার খাওয়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসুন। বের হওয়ার রাস্তায় দেখবেন একটি ছাতা। তবে এটি যেনতেন ছাতা নয়, রুপার হাতলের ছাতা। জমিদার বাবুরা যখন প্রজাদের সুখ-দুঃখ দেখার জন্য বের হতেন তখন দু’জন লোক এটি বয়ে বেড়াত। মূল বাড়ি থেকে বের হয়ে এবার শ্মশানে চলে আসুন। এখানে সমাহিত রয়েছেন জমিদার রাম মোহন রায়, কৃষ্ণমোহন রায়, গৌরি মোহন রায়সহ বহু জমিদার। তবে হিন্দুরীতি অনুযায়ী আগুনে দাহ না করে মাটি দেয়া হয় সাধু পুরুষ কমলাকান্ত রায়কে। এখানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় মোমবাতি জালানো হয়। হিন্দু-মুসলমান সবাই তাকে সম্মান করত। তার ভক্তদের মুখে শুনবেন তার সমাধির সামনের পুকুরটির নাম ফেনপুকুর । এক সময় বহু ভক্ত এখানে আসত। তাদের জন্য ফ্রি খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। শোনা যায়, তাদের জন্য রান্না করা ভাতের মার ফেলতে ফেলতে এ যায়গাটি গর্ত হয়ে পুকুরটির সৃষ্টি হয়েছে। সমাধি সৌধ অতিক্রম করে সামনে গেলে দেখতে পাবেন বেশ কয়েকটি মন্দির। এলাকাবাসরী মুখে শুনবেন, শুধু মন্দির নয় জাহাপুরের জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু রাস্তা, ব্রিজ-কালভার্ট, মাদ্রাসা, হাইস্কুল, পোস্ট অফিস ও দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে উঠেছে। হাতে সময় থাকলে সব ঘুরে ঘুরে দেখবেন। এ সময় আপনাকে সহযোগিতা করবেন জমিদার বংশের বারতম বংশধর অধ্যক্ষ রঞ্জন কুমার রায়। কিভাবে যাবেনঃ ঢাকার সায়েদাবাদ ও রাজধানী সুপার মার্কেটের সামনে থেকে কুমিল্লা অথবা কোম্পানীগঞ্জগামী সৌদিয়া, তিশা অথবা অন্য কোন লাক্সারিয়াস বাসে উঠবেন। ময়নামতি সংলগ্ন ক্যান্টেনমেন্টে পৌঁছবেন কুমিল্লা শহরের আগে মাত্র ২ ঘণ্টায়। কোম্পানীগঞ্জের বাসে উঠলে আর বাস পরিবর্তন করতে হবে না। কুমিল্লার বাসে উঠলে ময়নামতিতে নামতে হবে। এখান থেকে আবার কোম্পানীগঞ্জের বাসে উঠে দেবিদ্বারের পান্নারপুলে নামতে হয়। সেখান থেকে বাখরাবাদ রোডে ১০ কিলোমিটার গেলেই জাহাপুর পৌঁছতে পারবেন। ফেরার পথ যদি নিজস্ব যানবাহনে আসেন তাহলে দিনে দিনেই ফিরতে পারবেন। সমস্যা হলে কোম্পানীগঞ্জ অথবা দেবিদ্বারের কোন হোটেলে উঠুন। অথবা ১ ঘণ্টা হাতে নিয়ে কুমিল্লা শহরের অন্য যে কোন হোটেলে উঠুন।
যাতায়াতঃ কিভাবে যাবেনঃ-
সকাল ৮ টায় সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া লাইন/এশিয়া ট্রান্সপোর্টে (যেটা আগে ছাড়ে) চড়ে বসুন। ভাড়া নিবে ২০০ টাকা। কুমিল্লা ক্যান্টনম্যান্ট এসে নামবেন। সাড়ে ১০ টার আগেই পৌঁছে যাবেন। তবে আপনি যদি এসিতে আসতে চান তাইলে সায়েদাবাদ থেকে এশিয়া এয়ার কন্ডিশন অথবা কমলাপুর থেকে রয়েল কোচে আসতে পারেন। রয়েল অনেক কমফোর্টেবল বাট স্লো। ক্যান্টনম্যান্ট নেমে উত্তর দিকে ১০ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদের সমাধি ক্ষেত্র ওয়ার সিমেট্রি। বেশ নিরিবিলি পরিবেশটা আপনার ভাল লাগবে। ৩০ মিনিটের মধ্যেই ঘুরে দেখতে পারবেন। । এরপর আবার ক্যান্টনম্যান্ট ফিরে আসুন। রাস্তায় দাঁড়ালেই কুমিল্লা শহরগামী অনেক বাস যেমন পাপিয়া, কুমিল্লা হোমনা, সুগন্ধা, বিরতিহীন পাবেন। যে কোন একটায় উঠে পরুন। শাসনগাছা নামবেন। ভাড়া নিবে ১০ টাকা। এরপর অটোতে করে চলে যান কুমিল্লা জজ কোর্টের সামনে। সর্বোচ্চ ১৫ টাকা নিবে। সেখান থেকে কুমিল্লা পার্ক ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যাবেন ধর্মসাগরের উত্তর পাড়। চোখ জুড়ায়ে দেখুন ঐতিহাসিক ধর্মসাগর। আপনি চাইলে ধর্মসাগরের ভিতরে বোট রাইড করতে পারেন। ধর্মসাগর দেখতে দেখতে একবারে চলে আসুন দক্ষিণ মাথায়। এরপর একটু সামনে হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন কান্দিরপাড়। । যদি রসমালাই নিতে চান তাইলে কান্দিরপাড় থেকে পূর্বদিকে হাটা দিন। যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই মাতৃভান্ডার দেখায়া দিবে। রসমালাই কিনে কান্দিরপাড় থেকে সিএনজিতে উঠুন পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডের। ২০ টাকা নিবে ভাড়া। বিশ্বরোড পৌছাতে পৌছাতে ততক্ষণে লাঞ্চ টাইম হয়ে যাবে। লাঞ্চ করতে পারেন দেশের প্রথম ৩ স্টার হোটেল নুরজাহানে। তবে খাবার ব্যয়বহুল। হোটেলের বাহিরের প্লেসটা আপনার ভাল লাগবে। পুরাই একটা মিনি পার্ক। খাবার অর্ডার করে বাইরে বসে খেতে পারেন। চেয়ার টেবিল বসানোই আছে। তখন মনে হবে আপনি বনভোজনে বসে খাচ্ছেন। আর যদি আপনার বাজেট কম তাইলে বিশ্বরোডে আরও অনেক হোটেল পাবেন। ঐগুলাতেও খেতে পারেন। আপনি যদি আমার মত লেটে লাঞ্চ করার লোক হন তাইলে লালমাই পাহাড় দেখে ফিরার সময় লাঞ্চ করতে পারেন বিশ্বরোডেই। বিশ্বরোড থেকে সিএনজিতে চলে যান লালমাই বাজারে। ভাড়া নিবে জনপ্রতি ২০ টাকা। লালমাই বাজার থেকে অটোতে চলে যান চন্ডিমুড়া পাহাড়ে। লাল মাটি ঘেরা পাহাড়ের পরিবেশ আপনাকে অন্য রকম অনুভূতি দিবে। ঘণ্টা খানেক চারপাশটা ঘুরে দেখেন। তবে সাবধান পাহাড়ের বেশি ভিতরে যাবেন না। ছিনতাইয়ের শিকার হতে পারেন। লালমাই পাহাড় দেখে আবার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে ফিরে আসেন। । সেখান থেকে মাইক্রোতে করে চলে আসুন কোটবাড়ি বিশ্বরোড। ভাড়া নিবে ১৫ টাকা। এরপর সিনজিতে করে সোজা কোটবাড়ি বাজার। ১০ টাকা নিবে প্রতিজনে। সিএনজি থেকে নেমেই দেখতে পারেন তাক লাগানো বার্ডের গেট। তবে বার্ডের ভিতরে ঢুকতে দিবে না কারও রেফারেন্স ছাড়া। অবশ্য জাতীয় দিবসগুলোতে সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। বার্ডের গেট দেখে সোজা পশ্চিম দিকে হাটা দিন। সাইনবোর্ডই আপনাকে জানিয়ে দিবে ইটাখোলা মুড়ার কথা। সেখানে একটা প্রাচীন বিহার আছে। সাথে ধ্যানমগ্ন এক মূর্তি। ২০/২৫ মিনিটে সব দেখা শেষ করে আবার কোটবাড়ি বাজারে ফিরে আসুন। এরপর অটো/সিনজিতে উঠে পরুন। ড্রাইভারকে বললেই শালবন বিহারের গেটে নামায়া দিবে। ভাড়া নিবে ১০ টাকা। । এরপর টিকেট কেটে ঢুকে পরুন প্রাচীন ঐতিহ্যে ঘেরা শালবন বিহারে। ২০ টাকা প্রবেশ ফি। বিহারের চারপাশের কৃত্রিম পরিবেশটাও আপনাকে নাড়িয়ে দিবে। ঘণ্টা দেড়েক এখানে কাটাতে পারেন। এরপর দেখতে পারেন ময়নামতি মিউজিয়াম। প্রবেশ ফি ১০ টাকা। তবে এটার ভিতরে এখন তেমন কিছুই নাই। শালবন বিহার থেকে বেরিয়ে রাস্তার পশ্চিম পাশে যে বন দেখতে পাবেন ঐটাই শালবন । শালবনে ঘুরাঘুরি করতে পারেন। বৈকালিক স্ন্যাকস করতে পারেন কাশবন রিসোর্টে। আশা করি সাড়ে ৫ টার আগেই আপনার সব দেখা হয়ে যাবে। এরপর শালবন বিহারের গেট থেকে সিনজিতে উঠে পরুন। কোটবাড়ি বিশ্বরোড নামবেন। ২০ টাকা নিবে। । এরপর অপেক্ষা করতে থাকেন এশিয়া ট্রান্সপোর্টের। বাস আসলে হাত দেখালেই থামাবে। উঠে পড়ুন। ২০০ টাকা নিবে। আর আপনি যদি এসিতে আসতে চান তাইলে কোটবাড়ি বিশ্বরোড থেকে মাইক্রো দিয়ে ক্যান্টনম্যান্ট চলে আসুন। ভাড়া নিবে ২০ টাকা। ক্যান্টনম্যান্ট থেকে এশিয়া এয়ার কন্ডিশন/রয়েল কোচে উঠতে পারবেন। আশা করি রাত ৮ টার আগেই আপনি ঢাকা পৌঁছে যাবেন।
























0 comments:
Post a Comment